ঝুঁকি কমাতে ব্যাংকের তারল্য হিসাব নতুন নিয়মে
সিলেটের সময় ডেস্ক :
ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদি তারল্য স্থিতিশীলতা বাড়াতে নিট স্থিতিশীল তহবিল অনুপাত (এনএসএফআর) রিপোর্টিং কাঠামোতে পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খোলা বাজার কার্যক্রমের (ওএমও) সংশোধিত নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বাসেল-৩ তারল্য কাঠামোর আওতায় বিদ্যমান এনএসএফআর রিপোর্টিং ব্যবস্থায় বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। গত জুন মাস থেকে নতুন টেমপ্লেটে তথ্য জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারভাইজরি ডাটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স ডিপার্টমেন্ট (এসডিএডি) থেকে এ সংক্রান্ত সার্কুলারও জারি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, দেশের অর্থবাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন সহজতর করা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার লক্ষ্যেই এ পরিবর্তন আনা হয়েছে।
ওএমও কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে সংশোধন : বাসেল-৩ এর আওতায় ব্যাংকগুলোর তারল্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আগে থেকেই তারল্য কভারেজ অনুপাত (এলসিআর) ও নিট স্থিতিশীল তহবিল অনুপাত (এনএসএফআর) চালু করেছে। ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি জারি করা ডিওএস সার্কুলার নং-১ অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে এসব অনুপাত বজায় রাখতে হয়।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জারি করা ডিএমডি সার্কুলার নং-২-এর মাধ্যমে খোলা বাজার কার্যক্রমের (ওএমও) সংশোধিত নির্দেশিকা দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোর অধীনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপো, স্ট্যান্ডিং ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) এবং ইসলামিক ব্যাংকস লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি (আইবিএলএফ)-এর হিসাবায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে এসব লেনদেনকে যেভাবে হিসাব করা হতো, তার পরিবর্তে এখন এগুলোকে সরাসরি বিক্রয় লেনদেন নয়, বরং জামানতযুক্ত ঋণ বা অর্থায়ন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই এনএসএফআর রিপোর্টিং কাঠামো সংশোধন করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থায়ন আলাদা দেখাতে হবে : সংশোধিত নির্দেশনায় এনএসএফআর রিপোর্টিংয়ে নতুন একটি উপাদান যুক্ত করা হয়েছে। ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জামানতযুক্ত ঋণ বা অর্থায়ন’ নামে নতুন এই খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপো, এসএলএফ, আইবিএলএফ, অ্যাসিওরড রেপো এবং এ ধরনের অন্যান্য সুবিধার তথ্য দেখাতে হবে। এ ছাড়া আন্তঃব্যাংক রেপোকে এনএসএফ নির্দেশিকার ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিকট দেনার পরিমাণ’ খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনার তথ্য আরও ঝুঁকি সংবেদনশীল ও কার্যকরভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হবে।
সরকারি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিকিউরিটিজের হিসাবেও পরিবর্তন : এনএসএফআর রিপোর্টিংয়ের সম্পদ অংশেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে এক বছর বা তার বেশি এবং এক বছরের কম মেয়াদি ঋণ সিকিউরিটিজের ক্রয়মূল্য আলাদাভাবে দেখানোর যে ব্যবস্থা ছিল, তা সংশোধন করে সরকারি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সিকিউরিটিজের জন্য নতুন শ্রেণি নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত দায়মুক্ত বাজারযোগ্য সিকিউরিটিজ এবং দায়বদ্ধ বাজারযোগ্য সিকিউরিটিজ আলাদাভাবে রিপোর্ট করতে হবে। এ ক্ষেত্রে হোল্ড টু ম্যাচিউরিটি (এইচটিএম) সিকিউরিটিজের জন্য অ্যামোর্তাইজড কস্ট মূল্য এবং হোল্ড ফর ট্রেডিং (এইচএফটি) সিকিউরিটিজের জন্য বাজার মূল্য বিবেচনায় নিতে হবে।
দেশি-বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের শ্রেণিতেও পরিবর্তন : এনএসএফআর রিপোর্টিংয়ের আরেকটি অংশে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দেওয়া ঋণ, বিনিয়োগ ও আমানতের শ্রেণিবিন্যাসেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত অন্যান্য ফাইন্যান্স কোম্পানিতে দেওয়া ঋণ, বিনিয়োগ ও আমানত আলাদাভাবে রিপোর্ট করতে হবে। দেশের বাইরে অবস্থিত ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দেওয়া ঋণ, বিনিয়োগ ও আমানত পৃথকভাবে দেখাতে হবে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর আন্তঃপ্রতিষ্ঠান এক্সপোজার ও তারল্য অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করা যাবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নতুন টেমপ্লেটে জমা দিতে হবে তথ্য : বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সব তফসিলি ব্যাংককে সার্কুলারের সঙ্গে সংযুক্ত সংশোধিত এনএসএফর রিপোর্টিং টেমপ্লেট ব্যবহার করে রিটার্ন প্রস্তুত ও জমা দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন কোনো নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত গত ৩০ জুন শেষ হওয়া রিপোর্টিং সময় থেকে এই সংশোধিত টেমপ্লেট কার্যকর থাকবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এই সংশোধনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর দীর্ঘমেয়াদি তহবিল স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং তারল্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে।
