আন্দোলন দমাতে গ্রেপ্তার বিএনপি ও জামায়াতের ১২শ নেতাকর্মী

সিলেটের সময় ডেস্ক :

 

আজ ২২ জুলাই। ২০২৪ সালের এই দিনে কোটা সংস্কার আন্দোলন দমাতে সারাদেশে বিএনপি ও জামায়াতের প্রায় ১২শ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ দিন গণভবনে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট কোটাবিরোধী আন্দোলনের নামে সারাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে বলেছেন, শেখ হাসিনা পালিয়েছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা পালায় না।’ তার এ বক্তব্য বেশ আলোচনার জন্ম দেয়।

এ দিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আজ দেশের যে অবস্থা, গোটা পরিস্থিতির জন্য সরকার দায়ী। কারণ ছাত্র আন্দোলনের শুরুতেই সরকারকে বলেছিলাম, আলোচনা করে সমাধান করতে। কিন্তু তারা শোনেনি, বরং আন্দোলন নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য ছাত্রদের আরও উত্তেজিত করেছে। উপরন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে পুলিশের অভিযান ছিল ভয়াবহ। এরপরে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। যে কারণে এটা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এটা হচ্ছে ছাত্র-জনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।

২১ জুলাই রাত ১২টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৫১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ নিয়ে গত ১৭ জুলাই থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে দুই হাজার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ দিন পর্যন্ত কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সারাদেশে ১৬৪টি মামলা করা হয়। চিরুনি অভিযানে গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এদিকে র‌্যাবের বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন ২২ জুলাই সারাদেশে অভিযান চালিয়ে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করে। আগের দিন ২১ জুলাই নাশকতায় জড়িত থাকার অভিযোগে সারাদেশে ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

২১ জুলাই থেকে ২২ জুলাই সকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে চট্টগ্রাম মহানগরে ৪৬ জন, নারায়ণগঞ্জে ১১০, গাজীপুরে ১৫৬, বগুড়ায় ৯৪, ঠাকুরগাঁওয়ে ২৫, লালমনিরহাটে ২, টাঙ্গাইলে ৩৯, রংপুরে ১৮, জয়পুরহাটে ৩৬, কক্সবাজারে ২৪, বরগুনায় ২৫, বরিশালে ১৩, দিনাজপুরে ৩১, জামালপুরে ১৮, ঝিনাইদহে ১৩, কুমিল্লায় ৯১, নাটোরে ৪, ফেনীতে ৮, গাইবান্ধায় ৪৫, ফরিদপুরে ১৭, পঞ্চগড়ে ৪, কিশোরগঞ্জে ২৬, লক্ষ্মীপুরে ১৪ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

২২ জুলাই গভীর রাতে নয়াপল্টনে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায়ের রাজনৈতিক অফিসে ভাঙচুর-লুটপাট করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ দিন দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর গুলশানের বাসা, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রশদির লুনা ও সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের বনানীর বাসা, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের বাসায় তল্লাশি চালানো হয়।

অন্যদিকে, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, আন্তর্র্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন অসীমকে এ দিন পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরাফাতুল রাকিবের আদালতে দাঁড়িয়ে বিচারকের উদ্দেশে জহিরউদ্দিন স্বপন বলেন, আমি আপদমস্তক একজন রাজনৈতিক কর্মী, দেশের জন্য রাজনীতি করি। আমার রাজনীতির বয়স প্রায় ৫০ বছর। আমার রাজনীতিটা অনেকটা ঘরোয়া; আমি রাজপথের আন্দোলনে থাকি না। সেতুভবনে আগুন দেওয়ার মতো কোনো ঘটনায় আমি ছিলাম না। আমি রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম, সেখান থেকে আমাকে পুলিশ তুলে এনেছে। আজ আমার এনজিওগ্রাম করার কথা ছিল। আমার দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।

২২ জুলাই কোটা সংস্কার সংক্রান্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ দিন রাত ৯টায় তিনি এ সারসংক্ষেপে স্বাক্ষর করেন। এর আগে দুপুরে শেখ হাসিনা কিছু ব্যবসায়ীর সঙ্গে গণভবনে মতবিনিময়কালে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও সহিংসতার জন্য বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরকে দায়ী করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে আরও শক্ত অ্যাকশন নেওয়ার কথা জানান।

এদিকে ২২ জুলাই পঞ্চম দিনের মতো পুরো দেশকে ইন্টারনেট সংযোগবিহীন করে রাখে সরকার। এক নির্বাহী আদেশে সাধারণ ছুটি আরও এক দিন (২৩ জুলাই পর্যন্ত) বাড়ানো হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম চার দফা দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি স্থগিত করেন। অন্যদিকে ১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে জারিকৃত কারফিউর তৃতীয় দিন ছিল ২২ জুলাই। এ দিন দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল রাখা হয়।

এ দিন রাজধানীর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত ছিল। যদিও গোটা দেশজুড়েই বিরাজ করছিল একধরনের চাপা উত্তেজনা। রাজধানীর পথে পথে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাবের ব্যাপক অবস্থান দেখা যায়। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মোতায়েন ছিল সাঁজোয়া যান; আকাশে পুলিশ-র‌্যাবের হেলিকপ্টার টহল। এ দিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই আন্দোলনকারী মারা যান। এ নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে আন্দোলনে নিহত ৬৮টি লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২২ জুলাই সেনাপ্রধান যাত্রাবাড়ীসহ ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করা সেনা সদস্যদের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। এ সময় সেনাপ্রধান বলেন, ‘জনগণের স্বার্থে এবং রাষ্ট্রের যেকোনো প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সদস্যরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশব্যাপী কাজ করে যাচ্ছে।’

এ ছাড়া এ দিন যাত্রাবাড়ী এলাকা পরিদর্শন করেন পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, র‌্যাবের মহাপরিচালক মো. হারুন অর রশিদ এবং ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান। এ সময় আইজিপি সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রতিটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পাই পাই করে হিসাব দিতে হবে।’

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে সরকারের হুমকি-ধমকি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিস্তর অভিযান ও ধরপাকড়, সড়কে সড়কে সাজোয়া যান ও পুলিশের সশস্ত্র অবস্থানেও শেষ রক্ষা হয়নি সরকারের। অদম্য আন্দোলনের মুখে ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের; নতুন স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু হয় নতুন এক বাংলাদেশের।

এ বিভাগের অন্যান্য