কক্সবাজারে প্যারাসেইলিং যেন মারণফাঁদ

সিলেটের সময় ডেস্ক :

 

কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের হিমছড়ি ও দরিয়ানগর সৈকতের ৫টি প্যারাসেইলিং প্রতিষ্ঠান যেন মারণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এসব প্যারাসেইলিংয়ে গত দুই বছরে অন্তত ১০ পর্যটক নানাভাবে আহত হয়েছেন। গতকাল প্রাণ গেল এক পর্যটকের। অভিযোগ রয়েছে, যাঁরা প্যারাসেইলিং পরিচালনা করছেন, তার মধ্যে অনেকেই অদক্ষ। আর মানছেন না প্রশাসনের নির্দেশনা ও শর্ত।

প্যারাসেইলিং করতে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে কয়েকজন পর্যটক আহত হওয়ার পর গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে প্যারাসেইলিং পরিচালনা কার্যক্রম সাময়িক বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছিল প্রশাসন। তবে রহস্যজনক কারণে আবারও চালু করা হয়। দরিয়ানগরে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করছে ‘ফ্লাই এয়ার সি স্পোর্টস প্যারাসেইলিং’ নামের বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের মালিক মোহাম্মদ ফরিদ বলেন, তাঁদের চারটি প্যারাসেইলিং, দুটি জলযান জেট স্কি, পাঁচটি স্পিডবোট আছে। শনিবার তাঁর প্রতিষ্ঠানেই প্যারাসেইলিংয়ের সময় এক পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্যারাসেইলিংয়ের টিকিট কেনার সময় উড্ডয়নকারীকে কাগজে অঙ্গীকারনামা বা চুক্তিতে সই করতে হয়। চুক্তিতে লেখা থাকে প্যারাসেইলিং করার সময় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সেটার দায়দায়িত্ব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নেবে না। অর্থাৎ প্যারাসেইলিং করার সময় নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে নিজেকেই সতর্ক থাকতে হয়। আর এই সূক্ষ্ম সুযোগ কাজে লাগিয়ে যেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে প্যারাসেইলিং প্রতিষ্ঠানগুলো।  খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ৩০ আগস্ট দরিয়ানগর এলাকায় প্যারাসেইলিং থেকে ছিটকে পড়ে এক পর্যটক ঝাউ গাছের সঙ্গে ঝুলে ছিলেন। পরে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। ‘স্যাটেলাইট ভিশন সি স্পোর্টস’ পরিচালিত প্যারাসেইলিং রাইডে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এই দুর্ঘটনার পরদিন থেকে সৈকতের সব ধরনের প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখে জেলা প্রশাসন। স্যাটেলাইট ভিশন সি স্পোর্টসের ব্যবস্থাপক নুর মোহাম্মদ বলেন, প্যারাসেইলিং ওড়াতে গেলে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। আকাশে ওঠার আগে এ সময় নিয়ম শিখিয়ে দেওয়া হয়। নিচ থেকে হ্যান্ডমাইকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়। অনেক সময় পর্যটকরা তা ফলো করতে না পারলে দুর্ঘটনা ঘটে।

এর আগে গত বছরের ২০ মে দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিংয়ের সময় সমুদ্রের পানিতে পড়ে আহত হয়েছিলেন একজন নারী পর্যটক। দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ‘ফ্লাই এয়ার সি’ নামের প্রতিষ্ঠানের প্যারাসেইলিং কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলেও কিছুদিন পর আবার চালু হয়। সে সময় প্রশাসন জানিয়েছিল, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে নিয়ম ভেঙে একসঙ্গে দুজনকে নিয়ে উড্ডয়ন করানো হয়েছিল। ওই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সরঞ্জাম জব্দ করে কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

সৈকতভ্রমণে আসা কয়েকজন পর্যটক জানান, নিয়ম না মেনে প্যারাসেইলিং পরিচালনার কারণে বহু পর্যটক ছিটকে পড়ে আহত হচ্ছেন। বারবার দুর্ঘটনার কারণে রোমাঞ্চকর প্যারাসেইলিং এখন বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ রযেছে, কক্সবাজারের দরিয়ানগর ও হিমছড়ি এলাকায় পরিচালিত এসব প্যারাসেইলিং প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাসরঞ্জামের মান, যান্ত্রিক সক্ষমতা এবং প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব রয়েছে। নিম্ন মানের লাইফ জ্যাকেটসহ অন্যান্য সরঞ্জামও বেশ পুরোনো ও সেকেলে। আধুনিক কোনো সরঞ্জাম ও উদ্ধারকারী টিম নেই। এ ছাড়া পর্যটকদের ‘আকাশে পাখির মতো ওড়ানো’র নামে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট প্যারাসেইলিং করিয়ে দেড় হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫-৬ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। কক্সবাজার জেলা সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ‘প্যারাসেইলিংয়ের মালিকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কঠোর মনিটরিং করতে হবে। পর্যটক বা রাইডারদের ইনস্যুরেন্সের আওতায় আনা উচিত, যাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তাঁরা ক্ষতিপূরণ পান। এ ছাড়া নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও খতিয়ে দেখা দরকার।

এদিকে গতকাল প্যারাসেইলিং চলাকালে হঠাৎ নিরাপত্তা হারনেস থেকে শৌভিক রায় (৩০) নামে এক পর্যটক ছিটকে সমুদ্রে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে সি স্পোর্টস প্যারাসাইলিং কর্তৃপক্ষ তাঁকে উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তিনি খুলনা সদরের বানিয়াখামার এলাকার শেখর রায়ের ছেলে। গতকাল সকালে ৯ বন্ধু মিলে কক্সবাজারে বেড়াতে যান অক্ষর শৌভিক রায়। পরে দরিয়ানগর এলাকায় প্যারাসেইলিং করার সময় তিনি সমুদ্রে ছিটকে পড়ে যান।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সুবক্তগীন মোহাম্মদ সোহেল জানান, বেলা ২টা ১০ মিনিটে তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পানিতে পড়ে ডুবে যাওয়ায় মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসান জানান, দুর্ঘটনার পর পর্যটকের লাশ উদ্ধার করে হাসপাতালে আনা হয়, এখন তা হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘আমরা খবর পেয়েছি। প্রশাসনের অগোচরে প্যারাসেইলিং পরিচালিত হচ্ছিল, পর্যটক মৃত্যুর ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিভাগের অন্যান্য