মাঝ সমুদ্রে গোপনে চলছে ইরানি তেলের বাণিজ্য
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ঃ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে মালয়েশিয়া উপকূলে ইরানি তেলের গোপন বাণিজ্য থেমে নেই। মাঝ সমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল খালাসের মাধ্যমে দক্ষিণ চীন সাগরে এই লেনদেন আগের মতোই চলছে বলে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং ডেটা থেকে জানা যায়, গত সপ্তাহে ‘হিউম্যানিটি’ নামের একটি ৩৩০ মিটার দীর্ঘ ইরানি তেলবাহী সুপারট্যাঙ্কার মালাক্কা প্রণালি অতিক্রম করে মালয়েশিয়ার ‘ইস্টার্ন আউটার পোর্ট লিমিটস’ (ইওপিএল) এলাকায় পৌঁছানোর পরপরই নিজেদের অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (এআইএস) অর্থাৎ লোকেশন ট্র্যাকার বন্ধ করে সম্পূর্ণ ‘ডার্ক’ হয়ে যায়। সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের এই উন্মুক্ত অংশে আরেকটি মধ্যস্থতাকারী জাহাজে নিজেদের অপরিশোধিত তেল খালাস করার জন্যই ট্যাঙ্কারটি লোকেশন বন্ধ রেখেছিল, যার চূড়ান্ত গন্তব্য মূলত চীন।
ঐতিহাসিকভাবে চীন ইরানের রপ্তানি করা তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ কেনে। বছরের পর বছর ধরে মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক জলসীমাসংলগ্ন এই ১২০০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত ইওপিএল অঞ্চলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা ইরানি, রুশ ও ভেনেজুয়েলার তেলের জন্য একটি অনানুষ্ঠানিক বাজার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গত কয়েক মাসে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানি বন্দরে একাধিকবার অবরোধ সৃষ্টি করা সত্ত্বেও এই অঞ্চলে তেল হাত বদলের কার্যক্রম বিন্দুমাত্র থামেনি। চলতি বছরেই অন্তত ৬২টি জাহাজ ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য, ইওপিএল, হংকং এবং উত্তর চীনের বন্দরগুলোর মধ্যে যাতায়াত করেছে। এসব জাহাজ একটি গোপন নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করে, যারা মূলত চীনের স্বাধীন ও ছোট আকারের বেসরকারি তেল শোধনাগারগুলোকে ‘টিপট’ তেল সরবরাহে ভূমিকা রাখে।
মালয়েশিয়ার ইওপিএল অঞ্চলটি আকার ও আয়তনে প্রায় হংকংয়ের সমান এবং এর শান্ত আবহাওয়ার কারণে মাঝ সমুদ্রে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তর করা অত্যন্ত সহজ। এলাকাটি মালয়েশিয়ার একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলের (ইইজেড) মধ্যে পড়লেও আন্তর্জাতিক আইনগত অস্পষ্টতার কারণে এখানে নজরদারি চালানো দেশটির জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং।
সম্প্রতি মালয়েশিয়া নিজেদের আইন সংশোধন করে অনুমতি ছাড়া জাহাজ নোঙর ও তেল স্থানান্তরের ওপর কড়াকড়ি আরোপের উদ্যোগ নিলেও, যে কোনো দিনে এই অঞ্চলে দুই শতাধিক জাহাজ নোঙর করে থাকে যার অর্ধেকেরই ইরানের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা লেনদেন সংস্থা ‘সুইফট’কে এড়িয়ে চীনের নিজস্ব ব্যাংকিংব্যবস্থা ‘সিআইপিএস’ ব্যবহার করে চীনা মুদ্রা রেনমিনবিতে এসব তেলের অর্থ পরিশোধ করা হয়।
চীন সরকার নীতিগতভাবে জাতিসংঘের অনুমোদনহীন যে কোনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে এবং সবসময়ই এই বাণিজ্যের তথ্য অস্বীকার করে। তবে চীনা কাস্টমসের তথ্যে দেখা যায়, দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান থেকে তেল আমদানির খবর না দেখালেও মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা তেলের পরিমাণ মালয়েশিয়ার মোট উৎপাদিত তেলের তুলনায় বেশি। অর্থাৎ কাগজপত্র পরিবর্তন করে ইওপিএল থেকে কেনা ইরানি তেলকেই মালয়েশিয়ার তেল হিসেবে চীন ব্যবহার করছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এসব কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে চীনের বেশ কয়েকটি ‘টিপট’ শোধনাগার এবং জাহাজ নিবন্ধক প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও চীন সরকার সেগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন অবরোধ সাময়িকভাবে তেলের চালান কমালেও, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এই দীর্ঘস্থায়ী গোপন তেল বাণিজ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি।
