ভলকার তুর্কের মেয়াদ আরও ৪ বছর বাড়াল জাতিসংঘ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ঃ
তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে ভলকার তুর্কের মেয়াদ আরও চার বছর বাড়ানোর প্রস্তাব বিপুল ভোটে অনুমোদন করেছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। তবে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইসরায়েল। ভোটের আগে ওয়াশিংটন জাতিসংঘে তাদের অর্থায়ন ও সম্পৃক্ততা পুনর্বিবেচনার হুঁশিয়ারিও দেয়। শনিবারবার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
শুক্রবার ১৯৩ সদস্যবিশিষ্ট সাধারণ পরিষদে অনুষ্ঠিত ভোটে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় ১৪৪টি দেশ। বিপক্ষে ভোট পড়ে ১০টি এবং ১৩টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
এর আগে রাশিয়া ভলকার তুর্কের মেয়াদ মাত্র দুই মাসের কিছু বেশি সময়, অর্থাৎ ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত বাড়ানোর একটি পাল্টা প্রস্তাব দেয়। তবে সাধারণ পরিষদের অধিকাংশ সদস্য সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
বর্তমান মেয়াদ আগামী অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা থাকায় গুতেরেস তাকে দ্বিতীয় দফায় আরও চার বছরের জন্য মনোনয়ন দেন। অনুমোদন পাওয়ায় অস্ট্রিয়ার আইনজীবী ভলকার তুর্কই প্রথম মানবাধিকার প্রধান হিসেবে টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবেন।
১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ভলকার তুর্ক ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলোর তদন্তের আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন সময় সরব ছিলেন। এ কারণেই তিন দেশের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
ভোটের আগে জাতিসংঘে ব্যবস্থাপনা ও সংস্কারবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জেফ বার্টোস বলেন, ‘ভলকার তুর্ককে পুনর্নিয়োগের পক্ষে ভোট দেওয়া প্রমাণ করবে যে জাতিসংঘের সবচেয়ে কঠোর সমালোচকেরা ঠিকই বলেছেন-এই প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হয়ে পড়েছে।’
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ‘যদি সাধারণ পরিষদ প্রক্রিয়াগত অনিয়ম, গোপন সমঝোতা এবং জাতিসংঘের পদগুলোর অপব্যবহার মেনে নেয়, তাহলে এর পরিণতি ভালো হবে না। যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে জাতিসংঘে নিজেদের সম্পৃক্ততা, অংশগ্রহণ এবং অর্থায়ন পুনর্মূল্যায়ন করবে।’
এর আগে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও ভোট পিছিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ভলকার তুর্কের পুনর্নিয়োগের উদ্যোগকে ‘প্রক্রিয়াগত অনিয়ম’ বলে আখ্যা দেয়। তাদের দাবি, পর্যাপ্ত আলোচনা ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর তদারকির সুযোগ না দিয়েই তড়িঘড়ি করে ভোট আয়োজন করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আফ্রিকার অধিকাংশ দেশ এবং লাতিন আমেরিকার অনেক রাষ্ট্র ভলকার তুর্কের দ্বিতীয় মেয়াদকে সমর্থন জানিয়েছে। চীনও তার পক্ষে ভোট দিয়েছে।
ভোটের পর জাতিসংঘে রাশিয়ার উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি দিমিত্রি চুমাকভ অভিযোগ করেন, ভলকার তুর্ক রাশিয়ার বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট এবং ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে আসছেন। তার দাবি, মহাসচিব গুতেরেস সাধারণ পরিষদের সামনে ঐক্যের পরিবর্তে ‘আরেকটি বিভেদের ইস্যু’ নিয়ে এসেছেন।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বিবৃতিতে ভলকার তুর্ককে বহাল রাখার প্রস্তাবকে ‘নৈতিক ব্যর্থতা’ বলে উল্লেখ করেছে। রাশিয়ার মতো তারাও মনে করে, নতুন মহাসচিব দায়িত্ব নেওয়ার পর মানবাধিকার প্রধানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল।
মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। সংস্থাটির জাতিসংঘবিষয়ক পরিচালক লুই শারবোনো বলেন, বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে থাকায় এমন একজন মানবাধিকার প্রধান প্রয়োজন, যিনি চীন, রাশিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশগুলোর চাপ উপেক্ষা করে মানবাধিকার রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিতে পারবেন।
