ভাটি বাংলার শিক্ষায় কি আমরা যথেষ্ট মনোযোগী?
বশির আহমদ জুয়েল
হাওর বাংলা, ভাটি বাংলা—প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা আমাদের তাহিরপুর। এই জনপদের মানুষের স্বপ্ন অনেক বড়। প্রতিকূলতা পেরিয়ে এখানকার সন্তানরা দেশ-বিদেশে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছে। অথচ এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে—তাহিরপুরের শিক্ষার মান কি আমরা প্রত্যাশিত পর্যায়ে নিতে পারছি?
প্রকাশিত ফলাফলের দিকে তাকালে বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগের। তাহিরপুর উপজেলার ২১টি বিদ্যালয়ে মোট ১,৪৮৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৬৫৫ জন; অর্থাৎ পাসের হার ৪৪.২৮ শতাংশ। বিপরীতে ৮৩১ জন পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৮ জন।
এই পরিসংখ্যান শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফল নয়; এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি একটি সতর্কবার্তা।
তবে সমালোচনা করার আগে ভালো ফলাফল করা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশংসা করতেই হয়। আয়তিয়াল ভিশন একাডেমি ৮০.৫৬ শতাংশ, জনতা উচ্চ বিদ্যালয় ৬৮.৪৯ শতাংশ, ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৬১.১২ শতাংশ, আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ৫৮.২৩ শতাংশ এবং বাঙালি উচ্চ বিদ্যালয় ৫১.৩৫ শতাংশ পাসের হার অর্জন করেছে। এছাড়া বাদাঘাট পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় ও কলাগাঁও চারাগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় ৫০ শতাংশ পাসের হার অর্জন করেছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও পরিচালনা কর্তৃপক্ষকে অভিনন্দন। তবে এখানেই থেমে থাকলে চলবে না। যারা ভালো করেছে, তাদের আরও ভালো করার প্রতিযোগিতায় যেতে হবে। শুধু পাসের হার নয়—জিপিএ-৫, মেধাবৃত্তি, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির যোগ্যতা এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে।
কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠতেই পারে—যেসব বিদ্যালয়ে অর্ধেকেরও কম শিক্ষার্থী পাস করেছে, সেখানে সমস্যাটা কোথায়?কোনো একটি বিদ্যালয়ের খারাপ ফলাফলের জন্য শুধু শিক্ষকদের দায়ী করা হয়তো ন্যায্য হবে না। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, অভিভাবকদের সচেতনতা, আর্থিক ও সামাজিক বাস্তবতা, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, প্রশাসনিক তদারকি—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, একজন শিক্ষকের আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ, পাঠদানের মান ও শিক্ষার্থীদের প্রতি ব্যক্তিগত নজর শিক্ষার ফলাফলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষ করে কোনো বিদ্যালয়ে যদি বছরের পর বছর আশানুরূপ ফলাফল না আসে, তাহলে শুধু ফল প্রকাশ করে দায় শেষ করা উচিত নয়। কেন শিক্ষার্থীরা ফেল করছে, কোন বিষয়ে বেশি ফেল করছে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী উপস্থিতি কেমন, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া শুধু তার নিজের ব্যর্থতা নয়; এর পেছনে পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজেরও কিছুটা দায় থাকে। তাহিরপুরের মতো হাওরাঞ্চলে শিক্ষার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও বেশি। বর্ষাকালে যোগাযোগ ব্যবস্থা, পারিবারিক অর্থনৈতিক সংকট, অনেক পরিবারের জীবিকার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ততা—এসব বাস্তবতা রয়েছে। তাই এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে অন্য এলাকার সঙ্গে শুধু তুলনা করলেই হবে না; তাহিরপুরের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ শিক্ষা পরিকল্পনা করতে হবে।
প্রয়োজনে প্রতিটি বিদ্যালয়ের ফলাফল বিশ্লেষণ করে ‘কেন ফেল করল’—তার বিদ্যালয়ভিত্তিক কারণ চিহ্নিত করতে হবে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্লাস, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত অভিভাবক সভা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
আমরা শিক্ষকদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে চাই না। শিক্ষকরাই পারেন তাহিরপুরের শিক্ষার চিত্র বদলে দিতে। তাই তাঁদের প্রয়োজন যথাযথ সম্মান, সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতা—সবকিছুর সমন্বয়।
যে বিদ্যালয়গুলো ভালো করেছে, তারা আরও এগিয়ে যাক। আর যেসব বিদ্যালয়ের ফলাফল হতাশাজনক, তারা এই ফলাফলকে ব্যর্থতার শেষ অধ্যায় হিসেবে নয়, নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সূচনা হিসেবে গ্রহণ করুক।
কারণ তাহিরপুরের সন্তানরা মেধায় পিছিয়ে নেই। সুযোগ, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং আন্তরিক পরিচর্যা পেলে তারাও অনেক দূর যেতে পারে। আমরা এমন একটি তাহিরপুর চাই, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী শুধু হাওরের সন্তান হওয়ার কারণে শিক্ষায় পিছিয়ে থাকবে না। আমরা চাই—হাওর বাংলার প্রতিটি বিদ্যালয় হবে সম্ভাবনার বাতিঘর।
এবারের ফলাফল তাই শুধু হতাশ হওয়ার বিষয় নয়; এটি আমাদের সবার জন্য একটি জাগরণের বার্তা।
প্রশ্ন একটাই—আমরা কি এই বার্তাটি গুরুত্ব দিয়ে শুনব?
