দাবানলে পুড়ছে ফ্রান্স-স্পেন, নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ঃ
নতুন তাপপ্রবাহ শুরুর আগেই ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ফ্রান্স ও স্পেনের ফায়ারসার্ভিস বাহিনী। তবে আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, সপ্তাহের মাঝামাঝি থেকে আবারও তাপমাত্রা বেড়ে গেলে আগুন নেভানোর কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা বলেছেন, সোমবার ও মঙ্গলবার দাবানল নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বুধবার থেকে আবারও তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করবে। একই সতর্কতা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তিনি বলেন, সামনে অত্যন্ত কঠিন সময় অপেক্ষা করছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি বছরের দাবানল মৌসুম নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ইতোমধ্যে যে পরিমাণ বনভূমি পুড়েছে, তাতে এটি ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলের বছরগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।
স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমে আভিলা অঞ্চলের দাবানল ইতোমধ্যেই দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দাবানলে পরিণত হয়েছে। সেখানে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। মাদ্রিদের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আরও দুটি দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা মিলিয়ে প্রায় ৭০ হাজার হেক্টরে পৌঁছেছে।
দেশটির আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলমান তাপপ্রবাহ অন্তত আগামী রবিবার পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এ সময় তীব্র গরমের পাশাপাশি দক্ষিণ দিক থেকে প্রবাহিত ঝোড়ো বাতাসের কারণে আগুন আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে আগুন নেভানো আরও কষ্টকর হবে।
ফ্রান্সেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিরন্দ এলাকায় ভয়াবহ দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ বলেন, আগুন অত্যন্ত তীব্র এবং অনির্দেশ্য আচরণ করছে। এমনকি এটি নিজেই বাতাসের প্রবাহ তৈরি করছে, যার কারণে আগুনের গতিপথ বারবার বদলে যাচ্ছে। দাবানল ইতোমধ্যে বোর্দো শহর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে পৌঁছে গেছে।
বোর্দোর মেয়র টমা কাজেনাভ জানান, আরও মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হলে তার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। শহরে বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বোর্দো সফর করেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। তিনি বলেন, সামনে কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত কঠিন হবে এবং সবাইকে ধৈর্য ও সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
জিরন্দের দাবানলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সে এটি সবচেয়ে বড় বনভূমি ধ্বংসের ঘটনাগুলোর একটি। দাবানলের কারণে প্রায় দুই লাখ ২০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
চলতি বছর জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ফ্রান্সে এক লাখ ১৬ হাজার হেক্টরের বেশি বন ও উদ্ভিদাঞ্চল আগুনে পুড়েছে। অথচ ২০২৫ সালের পুরো বছরে পুড়েছিল প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর। অন্যদিকে স্পেনে এ বছর ইতোমধ্যে এক লাখ ৭২ হাজার হেক্টর বনভূমি আগুনে ধ্বংস হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, এসব দাবানল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাবগুলোর একটি। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দাবানল আরও ভয়ংকর হচ্ছে, তাপপ্রবাহের সংখ্যা বাড়ছে এবং ভূমি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এটি এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং নতুন বাস্তবতা।
ইউরোপীয় কমিশনের পরিবেশ ও সবুজ রূপান্তরবিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা তেরেসা রিবেরা বলেন, জলবায়ু সংকটের পরিণতি মোকাবিলায় ইউরোপ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। তিনি জানান, আগামী অক্টোবরে আরও বিস্তৃত অভিযোজন কৌশল উপস্থাপন করা হবে।
দাবানল মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে ফ্রান্সে সাতটি উড়োজাহাজ ও চারটি হেলিকপ্টার পাঠিয়েছে। স্পেনেও পাঠানো হয়েছে ছয়টি উড়োজাহাজ, তিনটি বন অগ্নিনির্বাপণ দল এবং বিশেষজ্ঞ কর্মী। বোর্দো অঞ্চলে স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা করতেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন।
এদিকে পর্তুগালের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলেও একাধিক দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে এক হাজারের বেশি দমকলকর্মী ও উদ্ধারকর্মী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন।
ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের পুলিয়া অঞ্চলেও বড় ধরনের দাবানল দেখা দিয়েছে। গারগানো উপদ্বীপে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় সমুদ্রপথে চার শতাধিক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাসিলিকাতা অঞ্চলেও আরও ৫৮ জনকে বাড়িঘর ছেড়ে যেতে হয়েছে। দেশটি চলতি বছরের চতুর্থ তাপপ্রবাহের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। বুধবার থেকে সেখানে তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
ফ্রান্সের দাবানলের ধোঁয়ায় দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বায়ুর মান মারাত্মকভাবে খারাপ হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, শ্বাসকষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে। বাইরে বের হলে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সুরক্ষামাস্ক ব্যবহার, জানালা বন্ধ রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে ১৫ লাখের বেশি সুরক্ষামাস্ক ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পাঠিয়েছে।
