মেয়েকে বাঁচাতে হাওরে ঝাঁপ, প্রাণ গেল বাবার

সিলেটের সময় ডেস্ক :

 

কিশোরগঞ্জেহাওরের বিশাল জলরাশিতে মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ দিলেন মিলন নামের এক বাবা। সন্তানের জন্য নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করলেন, বাবারা সন্তানের জন্য সবকিছু পারেন, এমনকি জীবন দিতেও। তার আরেকটি মর্মস্পর্শী প্রমাণ রেখে গেলেন কিশোরগঞ্জ শহরের বাছির উদ্দিন মিলন (৪২) নামের একজন বাবা। নিজের জীবনের পরোয়া না করে প্রবল স্রোতে ডুবে যাওয়া মেয়ে শেমন্তী আক্তারকে (১৩) বাঁচাতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন তিনি। প্রাণপণ চেষ্টায় শেমন্তীকে নিরাপদে তীরে তুলতে পারলেও আর ফিরতে পারেননি নিজে। হাওরের উত্তাল স্রোতে নিভে যায় একজন স্নেহময় বাবার জীবন প্রদীপ।

গতকাল শুক্রবার বিকেলে হৃদয়বিদারক এ ঘটনাটি ঘটেছে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা হাওরের পাশে মিঠামইন উপজেলার হাসানপুর ব্রিজসংলগ্ন এলাকায়। কয়েক মিনিট আগেও যেখানে ছিল পরিবারের আনন্দ-উচ্ছ্বাস, মুহূর্তেই সেখানে নেমে আসে শোকের ছায়া।

নিহত মো. বাছির উদ্দিন মিলন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার গাইটাল পেট্রোল পাম্প এলাকার বাসিন্দা ও মো. আবু বাক্কার মাস্টারের ছেলে। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কর্মজীবনে অসংখ্য মানুষের শারীরিক ব্যথা লাঘবের চেষ্টা করা এই মানুষটি শেষ মুহূর্তে নিজের জীবন উৎসর্গ করে বাঁচিয়ে গেলেন নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ—তার মেয়েকে।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দিনের অবসরকে স্মরণীয় করে রাখতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে শুক্রবার বিকেলে হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়েছিলেন মিলন। পরিবারের সদস্যরা নৌকায় করে হাওর ঘুরে দেখছিলেন। একপর্যায়ে করিমগঞ্জ উপজেলার শেষ সীমান্ত ও মিঠামইন উপজেলার হাসানপুর ব্রিজসংলগ্ন একটি ডুবুডুবু সড়কের পাশে নৌকা থামিয়ে সবাই পানিতে নামেন গোসল করতে।

নিহতের পরিবার

গোসলের সময় হঠাৎ অসাবধানতাবশত গভীর পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করে মিলনের মেজো মেয়ে শেমন্তী আক্তার। মেয়েকে পানিতে হাবুডুবু খেতে দেখে এক মুহূর্তও দেরি করেননি তিনি। নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে সরাসরি পানিতে ঝাঁপ দেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মেয়েকে বাঁচানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালান মিলন। অনেক কষ্টে তিনি মেয়েকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে সক্ষম হন। কিন্তু মেয়েকে বাঁচানোর সেই সংগ্রামে নিজেই তীব্র স্রোত ও গভীর পানির সঙ্গে আর লড়াই করে উঠতে পারেননি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি পানির নিচে তলিয়ে যান।

পরিবারের সদস্যদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন দ্রুত ছুটে আসেন। স্থানীয় নৌকার মাঝি ও এলাকাবাসী দীর্ঘ সময় ধরে উদ্ধার অভিযান চালান। পরে তাকে পানির নিচ থেকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। উদ্ধারকারীরা তাকে মৃত অবস্থায় পান।

ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবারের সদস্যদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। যে মানুষটি কয়েক ঘণ্টা আগেও স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আনন্দে সময় কাটাচ্ছিলেন, অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই মানুষকেই নিথর দেহে ফিরে পেতে হয় স্বজনদের।

করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেব খান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘মেয়েকে উদ্ধার করতে গিয়ে বাছির উদ্দিন মিলন পানিতে তলিয়ে যান। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।’

শুক্রবার রাত ১০টার দিকে কিশোরগঞ্জ সার্কিট হাউসের সামনে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, বন্ধু ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

সহকর্মীরা জানান, মিলন ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, দায়িত্বশীল ও মানবিক একজন মানুষ। রোগীদের প্রতি তার আন্তরিকতা ছিল প্রশংসনীয়। পরিবারই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই পরিবারের একজন অতি আদুরে মেয়ে শেমন্তীকে বাঁচাতেই তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করে গেলেন।

এ বিভাগের অন্যান্য