অর্থনীতি ট্রিলিয়ন ডলারে রূপান্তরের কাজ চলছে
সিলেটের সময় ডেস্ক :
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করতে কাজ করছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি) আয়োজিত দিনব্যাপী ‘ফিকি এফডিআই কনফারেন্স-২০২৬ : ড্রাইভিং ফরেন ইনভেস্টমেন্ট ফর জবস অ্যান্ড প্রসপারিটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।
সম্মেলন শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী ইনভেস্টরস এক্সপো পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টল ঘুরে প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। আয়োজকরা জানান, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পরবর্তী ধাপে প্রবেশের প্রস্তুতি এবং বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের উদ্যোগ জোরদারে এই আয়োজন করা হয়। সম্মেলনে দেশ-বিদেশের প্রায় ৬০০ জন প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি, কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী, বহুজাতিক কোম্পানির নির্বাহী কর্মকর্তা, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী নেতা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা এতে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাজেটে বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নবায়নযোগ্য শক্তি, ওষুধশিল্প, ইলেকট্রনিক্স, ডিজিটালসেবা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, উন্নত বস্ত্রশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা এবং লজিস্টিকস। আমরা বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে একটি বৃহৎ উৎপাদন হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছি, আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পকে বৈচিত্র্যময় করছি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও দক্ষতায় অগ্রাধিকার দিচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর নির্ভর করে না বরং তা নির্ভর করে দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর। প্রতিটি ব্যবসায়িক নেতাকে সেই সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের অংশ হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা একসঙ্গে এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারি- যা হবে সুদৃঢ়, ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক। আমি সবাইকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও সাফল্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন ও দূরদর্শী বিএনপি সরকার চায়- আপনারা বাংলাদেশে আসুন, নতুন উদ্যোগ নিন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণ করুন। দেশীয় কিংবা বিদেশি- যে বিনিয়োগকারীই আসুন না কেন, সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও সময়োপযোগী নীতিমালার মাধ্যমে পাশে থাকবে। এটি শুধু আশ্বাস নয়, সরকারের অঙ্গীকার।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে এর পাশাপাশি আমাদের রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা ও সুদৃঢ় ভিত্তি। আমাদের রয়েছে দ্রুত বিকাশমান অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ ও পরিশ্রমী মানবসম্পদ, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান এবং নিরঙ্কুশ জনসমর্থনপুষ্ট একটি নির্বাচিত সরকার। এই শক্তিগুলো একত্রিত হয়ে বাংলাদেশকে টেকসই ও স্থায়ী সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য, একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মভিত্তিক, বিশ্ব অর্থনীতির সাথে যুক্ত এবং বেসরকারি খাতের গতিশীলতায় পরিচালিত অর্থনীতি গড়ে তোলা। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার এই অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি সুস্পষ্ট সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রদান করেছে।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর নির্ভর করছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর নির্ভর করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারি- যা হবে শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।’
বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন সহযোগী ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনায় তারা বিনিয়োগ বাড়াতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা, ব্যবসাবান্ধব নিয়ন্ত্রক কাঠামো, সহজ করব্যবস্থা, নির্বিঘ্নে মুনাফা প্রত্যাহারের সুযোগ, শক্তিশালী পুঁজিবাজার এবং উন্নত অবকাঠামো।
প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার ইতোমধ্যে আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আধুনিকায়ন, বিনিয়োগ সুরক্ষা জোরদার, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি, কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার সরলীকরণ এবং মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজার উন্নয়ন, স্টার্টআপে সহায়তা, অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ ও লালফিতার দৌরাত্ম্য কমানো, সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বন্দর, লজিস্টিকস ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফিকি এফডিআই রিপোর্ট-২০২৬ প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরও উন্নত করা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে ফিকির সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী, সিনিয়র সহসভাপতি দীপল আবেবিবিক্রমা, নির্বাহী পরিচালক টিআইএম নুরুল কবির, প্রাইসওয়াটারহাউসকুপার্স বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং পার্টনার শামস জামান এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাশরুর রিয়াজ প্রধানমন্ত্রীর হাতে এফডিআই রিপোর্ট তুলে দেন। পরে ফিকির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত একটি স্মারক উপহার দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের আগে তার উপদেষ্টা মাহদী আমিনের সঞ্চালনায় এক প্যানেল আলোচনায় সরকারের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক নীতি তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিডার চেয়ারম্যান আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি। প্রধানমন্ত্রী অতিথি সারিতে বসে পুরো আলোচনা উপভোগ করেন।
