পদত্যাগ করলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী
অ্যান্ডি বার্নহামের ওয়েস্টমিনস্টারে ফিরে আসার পর লেবার পার্টির এমপি ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের কয়েক দিনের তীব্র চাপের মুখে কিয়ার স্টারমার প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি শুধু প্রধানমন্ত্রী পদ থেকেই নন, একই সঙ্গে লেবার পার্টির প্রধান পদ থেকেও পদত্যাগ করছেন।
তবে লেবার পার্টির ভেতরে এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কিছু এমপি মনে করেন, বার্নহামকে পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যেতে দেওয়া উচিত, যাতে তার সক্ষমতা যাচাই করা যায়। অন্যদিকে অনেকের মতে, দীর্ঘ প্রতিযোগিতা দলটির জনপ্রিয়তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই তারা দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে।
গত কয়েক মাস ধরে নেতৃত্ব নিয়ে চলা তীব্র চাপের পর কিয়ার স্টারমার শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছেন। তার নেতৃত্ব প্রথম বড় সংকটে পড়ে ফেব্রুয়ারিতে, যখন আনাস সারওয়ার প্রকাশ্যে তাকে পদত্যাগের আহ্বান জানান। সে সময় মন্ত্রিসভার সদস্যরা স্টারমারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কম থাকলেও মধ্যপ্রাচ্য সংকট মোকাবেলা এবং ইরানকে ঘিরে সংঘাতে যুক্তরাজ্যকে সরাসরি জড়াতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তার অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছিল। তবে এপ্রিলে বিতর্ক নতুন করে শুরু হয়। তখন জানা যায়, ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত পিটার ম্যান্ডেলসন নিরাপত্তা যাচাই নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরও নিয়োগ পেয়েছেন।
লেবার পার্টির অনেক নেতা ও এমপি মনে করেন, এই নিয়োগ স্টারমারের ধারাবাহিক রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তেরই অংশ। এর মধ্যে শীতকালীন জ্বালানি ভাতা সীমিত করা এবং বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচিতে কাটছাঁটের মতো সিদ্ধান্তও ছিল, যা জনমত জরিপে দলের জনপ্রিয়তা কমিয়ে দেয়। পরে এসব সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের চেষ্টা করলেও দলের ভেতরে তার অবস্থান আরো দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক এমপি তাকে ক্রমশ দুর্বল ও অকার্যকর নেতা হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এ ছাড়া তার যোগাযোগ ও জনসংযোগ দক্ষতা নিয়েও দলের ভেতরে অসন্তোষ ছিল।
মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনের প্রচারণার সময় ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে গিয়ে অনেক লেবার এমপি বুঝতে পারেন যে কেয়ার স্টারমার সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছেন। অনেকের মতে, তিনি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনঅসন্তোষের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে লেবার পার্টির সামনে থাকা বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর স্টারমারকে পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণা করার আহ্বান ধীরে ধীরে জোরালো হতে থাকে। পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে পড়ে যখন ওয়েস স্ট্রিটিং নেতৃত্বের দৌড়ে প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে না পেরে সরে দাঁড়ান। একই সময়ে মেকারফিল্ড আসনে উপনির্বাচনের সুযোগ তৈরি হলে অ্যান্ডি বার্নহাম সংসদে ফিরে আসেন এবং সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে সামনে চলে আসেন।
এরপর স্টারমার তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলিকেও হারান। সামরিক ব্যয় পরিকল্পনা নিয়ে মতবিরোধের কারণে তার অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। লেবার পার্টির অনেক এমপি তখন বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, স্টারমারের নেতৃত্ব আর টেকসই নয়। তিনি লড়াই চালিয়ে যেতে চাইলেও ডাউনিং স্ট্রিটে তার সময় শেষ হয়ে এসেছে, এমন ধারণা দলটির ভেতরে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
স্টারমারের বিদায়ের মাধ্যমে একটি নাটকীয় রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। তিনি লেবার পার্টির চতুর্থ নেতা হিসেবে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে দলকে এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দিয়েছিলেন, যা টনি ব্লেয়ারের ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর আর কোনো লেবার নেতা অর্জন করতে পারেননি।
