১০ কর্মকর্তাকে গাড়ি কেনার সুবিধা দিতে বিনাসুদে ঋণ
সিলেটের সময় ডেস্ক :
সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতির আওতায় স্থগিত থাকা ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা আবার চালুর জন্য ১০ জন উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব পাঠিয়েছে অর্থ বিভাগ। তবে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। অর্থ বিভাগের এই সুপারিশকে ঘিরে প্রশাসনিক মহলে নীতিগত সমতা, ব্যয় শৃঙ্খলা এবং বিশেষ সুবিধা কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, অর্থ বিভাগ গত ৫ এপ্রিল সরকারি ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে সরকারি কর্মচারীদের গাড়ি কেনার সুদমুক্ত ৩০ লাখ টাকার বিশেষ অগ্রিম সুবিধা স্থগিত করে। ওই সিদ্ধান্তের ফলে পুরো প্রশাসনে এই ঋণ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু গত ৭ জুন সই করা প্রধানমন্ত্রীর জন্য পাঠানো অর্থ বিভাগের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ১০ জন কর্মকর্তা এর আগেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঋণচুক্তি সম্পন্ন করেছিলেন এবং তাদের অনুকূলে সরকারি আদেশ (জিও) জারি হয়েছিল। এই আগের চুক্তিকেই ভিত্তি করে তাদের ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল করে ৩ কোটি টাকার সুদমুক্ত ঋণ ছাড়ের সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের সারসংক্ষেপে সুপারিশ করা হয়েছে, যেহেতু চুক্তি ও জিও পরিপত্র জারির আগে সম্পন্ন হয়েছিল, তাই বিশেষ বিবেচনায় শর্ত শিথিল করা যেতে পারে।
যাদের জন্য বিশেষ বিবেচনার প্রস্তাব
সুপারিশ পাওয়া ১০ জন কর্মকর্তা সবাই উপসচিব পর্যায়ের এবং প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য। তারা হলেন- মুহাম্মদ আবদুল হাই মিলটন, পরিচালক (উপসচিব), পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ; নাজমুন নাহার হামিদ, উপসচিব, অর্থ বিভাগ; প্রশান্ত কুমার দাস, উপসচিব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়; আয়েশা হক, সহকারী মহাব্যবস্থাপক (উপসচিব), জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ; মো. আলমগীর কবির, পরিচালক (উপসচিব), বিয়াম ফাউন্ডেশন; মোহাম্মদ শামীম বেপারী, উপপ্রধান (উপসচিব), পরিকল্পনা কমিশন; আবেদা আফসারী, উপসচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; তৌহিদুজ্জামান পাভেল, জেলা প্রশাসক, মৌলভীবাজার; মো. আশরাফুল ইসলাম, উপসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং মো. সিদ্দিকুর রহমান, উপপ্রকল্প পরিচালক (উপসচিব), নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এদের মধ্যে দুজন ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা। বাকিরা ২৮তম ব্যাচের। প্রত্যেকের জন্য ৩০ লাখ টাকা করে ঋণ সুবিধা অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। এদের মধ্যে আবদুল হাই মিলটন লন্ডন দূতাবাসে প্রথম সচিব ছিলেন আওয়ামী লীগ আমলে।
কৃচ্ছ্রসাধন বনাম ‘আগের চুক্তি’ যুক্তি
অর্থ বিভাগের যুক্তিতে বলা হয়েছে, কৃচ্ছ্রসাধন পরিপত্র জারির আগে এসব কর্মকর্তা ঋণচুক্তি সম্পন্ন করেছিলেন এবং কিছু ক্ষেত্রে গাড়ি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানে অগ্রিম অর্থও দেওয়া হয়। ফলে এখন সুবিধা না পেলে তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেনÑ এই যুক্তি তুলে ধরে শর্ত শিথিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, গাড়ি সেবা নগদায়ন নীতিমালা ২০২০ (সংশোধিত)-এর ২ (গ) (অ) অনুযায়ী, উপসচিবরা পদোন্নতিপ্রাপ্তির তিন বছর পর গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণের প্রাধিকারপ্রাপ্ত হন। নীতিমালা অনুসারে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২২২ জন প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণের আবেদন করেন। এর মধ্যে চলতি বছরের ৫ এপ্রিলের আগে এই ১০ কর্মকর্তাসহ মোট ২১৩ জন কর্মকর্তার অনুকূলে ঋণ মঞ্জুর করা হয়। ইতোমধ্যে ২০২ জনের অনুকূলে গাড়ি ক্রয়ের জন্য ঋণের চেক ইস্যু করা হয়েছে। গত ৫ এপ্রিল থেকে গাড়ি ক্রয়ে সুদমুক্ত বিশেষ অগ্রিম প্রদান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হওয়ায় এই ১০ জনের সুদমুক্ত ঋণের চেক ইস্যু করা সম্ভব হয়নি।
জনপ্রশাসনের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিশেষ কার্যক্রম ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৬০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অব্যয়িত ৫৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তাই প্রাধিকারপ্রাপ্ত ওই ১০ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে পরিপত্রের শর্ত শিথিল করা যায় বলে অভিমত দেওয়া হয়। এতে করে ৩ কোটি টাকার চেক ইস্যু করার বিষয়টি সমীচিন হবে মর্মে মতামত দেয় অর্থ বিভাগ।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, ব্যয় সংকোচনের ঘোষণার পর একই নীতির আওতায় ব্যতিক্রমী ছাড়ের সুপারিশ প্রশাসনিক নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একই ক্যাডারের নির্দিষ্ট ১০ জনকে ঘিরে সিদ্ধান্ত হলে প্রশাসনে ভারসাম্যহীনতার ধারণা তৈরি হতে পারে।
এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক ও অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
প্রসঙ্গত, গত ২ এপ্রিল সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য দেওয়া সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা বন্ধ করার ঘোষণা দেয় সরকার। বিএনপি সরকার দায়িত্বগ্রহণের পর মন্ত্রিসভার চতুর্থ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শুধু ঋণ সুবিধাই নয়, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও চালকের বেতনের জন্য প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে ভাতা পান। এ ছাড়া গাড়ির জন্য প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে অবচয় সুবিধাও প্রযোজ্য রয়েছে। মন্ত্রিসভা বৈঠকের সিদ্ধান্ত তুলে ধরে সেসময় প্রেস ব্রিফিংয়ে বলা হয়, সরকারের পরিচালন ব্যয় কমাতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি ক্রয়ের জন্য সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া এবং সরকারি অর্থায়নে সব বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বন্ধ থাকবে। প্রশিক্ষণ ব্যয় ছাড়া অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ব্যয় ৫০ শতাংশ কমাতে হবে। সভা, সেমিনারে আপ্যায়ন ব্যয় ৫০ শতাংশ, সেমিনার, কনফারেন্স ব্যয় ২০ শতাংশ এবং ভ্রমণ ব্যয় ৩০ শতাংশ কমাতে হবে।
