শুভ জন্মদিন বঙ্গবীর

মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি বঙ্গবীর জেনারেল আতাউর গণি ওসমানীর ১০১তম জন্মবার্ষিকী আজ রোববার। ইতিহাসের ক্ষণজন্মা এই মহানায়ক ১৯১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে বাবার কর্মস্থলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস সিলেটের বর্তমান ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর গ্রামে। বঙ্গবীর এম এ জি ওসমানীর পিতার নাম খান বাহাদুর মফিজুর রহমান এবং মাতা জোবেদা খাতুন। দুই ভাই, এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।

বাংলাদেশের গর্বিত সন্তান বঙ্গবীর আতাউল গণি ওসমানী ছোট বেলা ‘আতা’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় ১৯২১ সালে আসামের কটনস স্কুলে। সর্বশেষ আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এম এ ১ম পর্ব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নকালে বাংলার এই বীর সেনানী ফেডারেল পাবলিক সার্ভিস পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন। কিন্তু তিনি ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ না দিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন।

১৯৪০ সালে তিনি দেরাদুন সামরিক প্রশিক্ষণ একাডেমি থেকে ইন্ডিয়ান আর্মির ‘কিংস কমিশন’ লাভ করেন। পাক-ভারত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ মেজর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে বার্মা রণাঙ্গনে সেনাবাহিনীর অধিনায়কত্ব লাভ করে তিনি অনন্য নজির স্থাপন করেন। ১৯৪৭ সালের ৭ অক্টোবর তিনি পাকিস্তানে আসেন এবং ওই সময় তাকে লে: কর্নেল পদে উন্নীত করা হয়।

১৯৪৮ সালে তিনি কোয়েটা স্টাফ কলেজে স্টাফ কোর্সে যোগদান করেন। সেখান থেকে তিনি পিএসসি ডিগ্রী লাভ করে সেনাবাহিনীর তদানীন্তন চীফ অব দি জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল রেহিলেন হার্ট এর সহযোগী হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তিনি খুলনা, যশোর, ঢাকা ও চট্টগ্রামের স্টেশন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৫ সালের ৭ নভেম্বর ব্রিগেডে অস্থায়ী ব্রিগেড কমান্ডার নিযুক্ত হন। তারপর ওই বছরই তিনি পাকিস্তান রাইফেলস’র কমান্ডার নিযুক্ত হন। ১৯৫৬ সালের মে মাসে তিনি মিলিটারী অপারেশনের ডেপুটি ডাইরেক্টর নিযুক্ত হন এবং কর্ণেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

১৯৬১ সালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক ইন্টারমিনিস্ট্রারিয়েল কমিটি গঠন করলে ওসমানীকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান প্রতিনিধি ও মুখপাত্র নিযুক্ত করা হয়। ১৯৬৪ সালে তাঁকে আধুনিক সামরিক ব্যবস্থা ও বৈজ্ঞানিক উন্নতি অনুধাবনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়। ১৯৬৫ সালে ওসমানীকে পাক-ভারত যুদ্ধে ডেপুটি ডাইরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশন পদে নিযুক্ত করা হয়। পরে ১৯৬৭ সালে আইয়ূব খান সামরিক বাহিনী থেকে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দেন। তিনি বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেয়ার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেন। মূলত জেনারেল এম এ জি ওসমানী ছিলেন বেঙ্গল রেজিমেন্টের স্বপ্নদ্রষ্টা।

ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ২ থেকে ৬ ব্যাটালিয়নে উন্নীত, সেনাবাহিনীতে বাঙালি নিয়োগ শতকরা দুই ভাগ থেকে দশভাগ বৃদ্ধি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের চল চল চল কবিতাকে মার্চ পাস্ট সঙ্গীতের মর্যাদা, বেঙ্গল রেজিমেন্টের সামরিক বাদ্যযন্ত্রে ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’ ইত্যাদি প্রচলন করেন। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে তিনি এম এন এ নির্বাচিত হয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

বিশ্ব ইতিহাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শতাব্দীর অন্যতম ঘটনা। স্বাধীনতাকামী কোটি কোটি মানুষকে পাকিস্তানি হায়েনা বাহিনীর রক্তাক্ত থাবা থেকে মুক্ত করার এক মহান ব্রত তিনি পালন করেন। বিক্ষিপ্তভাবে যুদ্ধরত মুক্তিবাহিনীকে সমন্বিত করে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন মহান মুক্তিযুদ্ধে। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করেন। ওসমানীর অসামান্য নেতৃত্বে মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে বীর বাঙালি স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনে। দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে সরকারি চাকুরি থেকে অবসর নেন ওসমানী।

১৯৭৩ সালে তিনি স্বাধীন দেশে জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু বাকশাল প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে তিনি আইন সভার সদস্য পদ ত্যাগ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী ১৯৮৪ সালের ১৬ আগস্ট ৬৬ বছর বয়সে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।

দেশের এই ক্ষণজন্মা বরেণ্য ব্যক্তিত্বের জন্মবার্ষিকী পালন উপলক্ষে সিলেটে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- তাঁর মাজার জিয়ারত, আলোচনা সভা ও মিলাদ মাহফিল।

এ বিভাগের অন্যান্য