ভারতের সহায়তায় ইলিয়াস আলীকে গুমের পরে হত্যা

সিলেটের সময় ডেস্ক :

 

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও ২০০১-০৬ মেয়াদে সিলেটের সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলী আর বেঁচে নেই। তাকে গুম করে হত্যার পর ধলেশ্বরী নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। মূলত তিনি রাষ্ট্রীয় হত্যার শিকার হয়েছেন। এখন বাকি শুধু রাষ্ট্রীয়ভাবে এ বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া।  এমন নির্মম ও হৃদয়বিদারক তথ্য সম্প্রতি উঠে এসেছে ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদের বর্ণনায়।

প্রায় দেড় বছর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম গুম কমিশনের বরাত দিয়ে সাংবাদিকদের জানান, ইলিয়াস আলীকে গুমের পর হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। প্রতিবেশী দেশের স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে তাদের বিশেষ বাহিনীর সহায়তায় ইলিয়াস আলী গুম-খুন মিশন চালানো হয়।

এবার ইলিয়াস আলী গুম-খুন নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন সাবেক ডিজিএফআই মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ। গ্রেফতারের পর তাকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও রাষ্ট্রীয় অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা। জিজ্ঞাসাবাদে ইলিয়াস আলী গুম নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করে তিনি দায় চাপান অন্যদের ঘাড়ে। অবশ্য বিএনপি নেতাকে গুম, নেপথ্য, কারা জড়িত এসব বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তথ্য দিচ্ছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টদের। ডিবি তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করছে।

শেখ মামুন খালেদ জানান, গুমের পর এম ইলিয়াস আলীকে হত্যা করা হয়। টিপাইমুখ বাঁধ এবং পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই তার জন্য কাল হয়েছিল। এই বাঁধ ও চুক্তি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইলিয়াস আলী এর বিরুদ্ধে গিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। লংমার্চ করেছিলেন সিলেটে। এরপরই সরকারের রোষানলে পড়েন তিনি। তাই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ইলিয়াস আলীকে সরিয়ে দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান ও র‌্যাবের মহাপরিচালককে গুমের মিশন বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেন। গুমের পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করে র‌্যাব-১। র‌্যাবকে সহযোগিতা করেন ডিজিএফআইয়ের ওই সময়ের কিছু কর্মকর্তা। এই মিশনে নেতৃত্ব দেন মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান। তিনিই গ্রেফতারের পর প্রথম ইলিয়াস আলীর ভাগ্যে কী ঘটেছে তা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ইলিয়াস আলীকে হত্যার পর নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

শেখ মামুন খালেদ জানান, শেখ হাসিনা ঘটনার আগে-পরে জিয়াউলের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেন। সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ইলিয়াস আলী ও তার ব্যক্তিগত গাড়িচালককে বনানী থেকে র‌্যাব-১ সদর দপ্তরে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আটকে রেখে ইলিয়াস আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর করা হয়। গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, তুলে নেওয়ার পর ১৭ থেকে ২০ এপ্রিলের কোনো এক রাতে ইলিয়াস আলীকে হত্যা করে ধলেশ^রী নদীতে ফেলে দেওয়া হতে পারে। তিনি ‘রাষ্ট্রীয় হত্যা’র শিকার হন। এমন খবর প্রকাশের পর সিলেটজুড়ে নেমে এসেছে নীরবতা।

এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন প্রধান প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলামের দেওয়া তথ্যের পর তোলপাড় শুরু হয়। তারপরও অনেকে এ নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। দাবি করছিলেন, গুম কমিশন থেকে যেন ইলিয়াস আলী বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য জানানো হয়। কিন্তু ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক শেখ মামুন খালেদের স্বীকারোক্তির পর সেই অস্পষ্টতা কেটে গেছে। এবার শুধু রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণার পালা।

এম ইলিয়াস আলী ছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি। তিনি ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য এবং সিলেট অঞ্চলের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় নেতা। ইলিয়াস আলী ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানী ঢাকা থেকে গাড়িচালক আনসার আলীসহ নিখোঁজ হন। তার নিখোঁজের ১৫ দিন আগে ঢাকা থেকে গুম করা হয় ইলিয়াস আলীর শিষ্য, সিলেট জেলা ছাত্রদলের একসময়কার সহসাধারণ সম্পাদক ইফতেখার আহমদ দিনারকে। তিনি ছিলেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদকও। গুরু-শিষ্যের এমন নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তখন সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে।

এম ইলিয়াস আলীর মা সূর্যবান বিবি এখনো জীবিত। তার পিতা কয়েক বছর আগে ইন্তেকাল করেছেন। রাষ্ট্র থেকে ইলিয়াস আলীর বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু না জানানোয় মা সূর্যবান বিবি, প্রিয়তমা স্ত্রী তাহমিনা রুশদীর লুনা এবং তার তিন সন্তানসহ পরিবারের সদস্য, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও এলাকাবাসী অপেক্ষায় ছিলেন সব শঙ্কা ভুল প্রমাণ করে একদিন ফিরবেন ইলিয়াস আলী। কিন্তু কারো মনের আশা আর পূরণ হবে না।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনার গুমঘর থেকে একে একে বেরিয়ে আসছিলেন বন্দি রাজনৈতিক নেতারা। তারপরও অনেকে ফেরেননি। কী ঘটেছে তাদের ভাগ্যে- এই প্রশ্ন যখন সর্বত্র, তখন আশায় বুক বেঁধেছিলেন গুম নেতাসহ অন্য ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা। এরই মধ্যে অনেকের পরিণতি সম্পর্কে জানাও গিয়েছিল। কিন্তু জানা যাচ্ছিল না ইলিয়াস আলীর ব্যাপারে।

পরে অবসর নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা দাবিদার এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে জানান, এম ইলিয়াস আলীকে গুমের কয়েকদিনের মাথায়ই হত্যা করা হয়েছে। সাগরে নিয়ে খাবার বানানো হয়েছে মাছের। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে জিয়াউল আহসান এই কাজ করেছেন। তবে নির্ভরযোগ্য সোর্স না হওয়ায় কেউই সে কথা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। সে সময় ফের ইলিয়াস আলীর বিষয়ে সরব হন সিলেট ও তার নির্বাচনি এলাকার বিএনপির নেতাকর্মীরা। তারা মিছিল-মিটিংও করেন। তখন ইলিয়াসপত্নী তাহমিনা রুশদীর লুনার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস ইলিয়াস আলী ফেরত আসার প্রত্যাশা ছড়িয়ে দেয় সাধারণ মানুুষ ও নেতাকর্মীদের মধ্যে। ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট রাতে লুনা তার ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করেন, ‘…প্রিয় ইলিয়াস আলীর জন্য দোয়া করবেন। …আমরা শুধু পরিবারের পক্ষ থেকে বলছি তার (ইলিয়াস আলী) জন্য দোয়া করতে। আমাদের এখনো দৃঢ় বিশ্বাস তিনি বেঁচে আছেন। প্রথম থেকেই আমরা এ আশা পোষণ করে আসছি। তাই সব সময় তার সুস্থতার জন্য বিভিন্ন স্থানে দোয়া করিয়েছি বা করাচ্ছি।’ এর আগে ওইদিন মাগরিবের নামাজের পর সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার গহরপুর জামেয়া মসজিদে ইলিয়াস আলীর পারিবারিক উদ্যোগে তার সুস্থতা কামনায় খতমে বুখারি ও দোয়া মাহফিল করা হয়। এতে বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলা বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। তখন আবারও গুঞ্জন ওঠে, তিনি বেঁচে আছেন। কিন্তু এ বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে কখনোই কোনো পরিষ্কার বক্তব্য আসেনি।

এ বিভাগের অন্যান্য