১২ কুকুরের পর এবার বিড়ালের ওপর নিষ্ঠুরতা
সিলেটের সময় ডেস্ক :
নিরীহ পথপশুর ওপর দীর্ঘদিন ধরেই বর্বরোচিত নির্যাতন চালানো হচ্ছে রাজধানীর ডিওএইচএস বারিধারায়। এর মধ্যে অন্তত ১২টি কুকুরকে মেরে ফেলা হয়েছে। এ বিষয়ে গত ১৮ জুলাই দৈনিক আমাদের সময়ে ‘ডিওএইচএস বারিধারার ১২ কুকুর মারল কে’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয় যা প্রাণীপ্রেমীদের হৃদয়মাত্রই নাড়া দিয়ে যায়। কিন্তু এতে হয়েছে হিতে বিপরীত। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর বারিধারা ডিওএইচএস পরিষদের সভাপতি কর্নেল (অব.) এম আব্দুল হাই আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা বলছেন, পরিষদের সভাপতি একের পর এক মনগড়া ‘আইন’ তৈরি করছেন যা আরও বেশি হুমকির মুখে ফেলছে এ এলাকার অবলা প্রাণীগুলোকে। এখন বারিধারা ডিওএইচএস এলাকায় বিড়ালদের খাবার দেওয়া যাচ্ছে না তারই নেপথ্য নির্দেশে। কেউ ক্ষুধার্ত এসব প্রাণীকে খাবার দিতে গেলেই তেড়ে আসছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। আর সংশ্লিষ্ট প্রাণীপ্রেমীর বাসায় চলে যাচ্ছে পরিষদের হুমকিমূলক নোটিশ। শুধু তাই নয়, ১২টি কুকুর হত্যার পর যে ৩টি কুকুর এখনও বেঁচে আছে, সেগুলোও গাড়িতে করে উঠিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর মধ্যে একটি মা কুকুর উঠিয়ে নিতে গিয়ে ধরা পড়েছেন এক ভ্যানচালক। তিনি স্বীকার করেছেনÑ পরিষদের নির্দেশেই কুকুরটি সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ইফতেখার খালেদ বলেন ‘আমাদের পরিষদের সভাপতি এম আব্দুল হাই ব্যক্তিগতভাবে কুকুর-বিড়াল ঘৃণা করেন। এ ঘৃণা তিনি চাপিয়ে দিতে চাইছেন সবার ওপর। তাই পরিষদের বিভিন্ন পদের সদস্যদের দিয়ে নোটিশ স্বাক্ষর করিয়ে প্রাণীপ্রেমীদের বাসায় বাসায় পাঠাচ্ছেন। আর নিরাপত্তাকর্মীদের লেলিয়ে দিচ্ছেন প্রাণীপ্রেমীদের পেছনে, বিশেষ করে যারা বিড়ালদের খাবার দিচ্ছেন। এর আগে তার নির্দেশে কুকুর তো মারা হয়েছেই, এবার তিনি বিড়াল মারার পরিকল্পনা করছেন। এই পরিস্থিতিতে প্রাণীপ্রেমীরা খুবই আতঙ্কে আছেন। একজন প্রাণীপ্রেমী আতঙ্কিত হয়ে থানায় জিডিও করেছেন।’
তার দেওয়া তথ্যের সূত্রে জানা গেছে, জিডিটি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা আকিবুর রহমান খান। তার কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমাদের সময়ে সংবাদ প্রকাশের পর পরিষদের কর্তাব্যক্তিরা ক্ষেপে যান এবং বিড়ালকে খাবার দেওয়া যাবে না, এই মর্মে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। কিন্তু খাবার না পেলে বিড়ালগুলো মারা যাবে, এ শঙ্কায় আমি এবং আমার স্ত্রী খাবার দিতে যাই। এ সময় নিরাপত্তাকর্মীরা তেড়ে আসেন এবং আমাদের সঙ্গে যারপরনাই দুর্ব্যবহার করেন। শুধু তাই নয়, তারা আমাদের হুমকি দেন। আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতে চান। তার হাত থেকে খাবারের পাত্র কেড়ে নেন। তখন আমরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে বিড়ালকে খাবার না দিয়েই ফিরে আসি এবং নিরাপত্তা চেয়ে ২৬ জুলাই ক্যান্টনমেন্ট থানায় জিডি (নং ১৬৩৯) করি। যদিও এ পর্যন্ত এ জিডির বিষয়ে পুলিশের কোনো তৎপরতা দেখিনি। এমনকি বিড়ালদের খাওয়ানোর মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। এখনও খাওয়াতে বের হলে নিরাপত্তাকর্মীরা তেড়ে আসেন; হুমকি দেন। আমরা আশঙ্কা করছি, অসহায় বিড়ালগুলো না খেয়ে মারা যাবে। এমনকি কুকুরদের যেভাবে মেরে ফেলা হয়েছে, সেভাবে বিড়ালগুলোও মেরে ফেলা হতে পারে।’
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, অবলা প্রাণীদের নিশ্চিহ্ন করতে পরিষদের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এম আব্দুল হাই যা খুশি তাই করছেন। কোনো বাসিন্দা প্রাণীদের পক্ষে কথা বলতে গেলেই তার বাসায় হুমকিমূলক নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। তেমনই বেশ কিছু নোটিশের কপি এসেছে এই প্রতিবেদকের হাতে। এসব নোটিশের ভাষা অপমানজনকই শুধু নয়, হুমকিমূলকও। যেমন ২২ জুলাই এক বাসিন্দাকে পাঠানো সিকিউরিটি মেম্বার লে. কর্নেল মো. আব্দুর রব (অব.) স্বাক্ষরিত একটি নোটিশের শেষ লাইনটি এমন ‘পরিষদের নির্দেশ অমান্য করে এরপরও যদি আপনি সড়ক বা শিশুপার্ক এলাকায় খাবার পরিবেশন অব্যাহত রাখেন এবং নিরাপত্তা প্রহরীর সাথে যদি কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার অবতারণা হয়, তার দায়ভার উক্ত পরিষদ বহন করবে না।’ এই নোটিশের বিষয়ে স্বাক্ষরকারী লে. কর্নেল (অব) মো. আব্দুর রবকে জিজ্ঞেস করলে কোনো বক্তব্য নেই বলে জানান তিনি। বলেন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে যেন সভাপতির (এম আব্দুল হাই) সঙ্গে কথা বলি। কারণ, সব সিদ্ধান্ত হয় তার নির্দেশে। এরপর ফোন করা হয় এম আব্দুল হাইকে। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে ফেসবুকে তিনি নিয়মিত পোস্ট দিচ্ছেন প্রাণীপ্রেমীদের বিরুদ্ধে। এমনই একটি পোস্টে তিনি লেখেনÑ ‘প্রাণীপ্রেমীরা বিকৃত রুচিসম্পন্ন। এরা মানসিকভাবে অসুস্থ।’
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় পশুপ্রেমী হিসেবে পরিচিত প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনের। তিনি বলেন, ‘এটা খুবই নিন্দনীয় কাজ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং প্রাণীদের পক্ষে। অতএব অবলা প্রাণীদের ওপর অত্যাচার বন্ধ হোক। সকল প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল হোক এই বাংলাদেশ।’
উল্লেখ্য, কুকুর হত্যার বিষয়টি গণমাধ্যমে তুলে ধরার জেরে পরিষদের মাধ্যমে হুমকি-ধমকির শিকার হচ্ছেন এ প্রতিবেদকও। পরিষদের সভাপতি ইতোপূর্বে এ প্রতিবেদকের বাসার ঠিকানাসহ অতিগোপনীয় কিছু তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো প্রতিবেদককে পাঠিয়ে জানান, ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ নাকি এসব তথ্য রেকর্ড করেছে। পরবর্তীকালে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। পুলিশ তা অস্বীকার করে। এরপরও বিভিন্নভাবে তাকে হেনস্তা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে এ প্রতিবেদকও ইতোমধ্যে থানায় জিডি করেছেন পরিষদের সভাপতির বিরুদ্ধে।
ডিওএইচএস বারিধারার একাধিক বাসিন্দা জানান, কুকুর-বিড়ালের ওপর নির্যাতন বন্ধে শিগগিরই তারা পরিষদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবেন।
