জননেতা কামরান মানুষের হৃদয়ে অম্লান এক নাম
বশির আহমদ জুয়েল
১৫ জুন। দিনটি আমার ব্যক্তিগত জীবনে এক বিশেষ দিন—আমার জন্মদিন। কিন্তু ২০২০ সালের এই দিনেই সিলেট হারিয়েছিল তার সবচেয়ে আপনজনদের একজনকে। তাই জন্মদিনের আনন্দ আজও এসে মিশে যায় এক গভীর বেদনায়। ১৫ জুন মানেই আমার কাছে শুধু জীবনের আরেকটি বছর পূর্ণ হওয়ার দিন নয়, বরং সিলেটের গণমানুষের নেতা, সাবেক মেয়র, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সাবেক সদস্য এবং সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মরহুম বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে স্মরণ করার দিন।
আজ তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই মানুষটিকে, যিনি রাজনীতিকে ক্ষমতার সিঁড়ি নয়, মানুষের সেবার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনেক নেতা এসেছেন, গেছেন। কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যাঁরা রাজনৈতিক পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পেরেছেন। বদর উদ্দিন আহমদ কামরান ছিলেন সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন।
তাঁর জনপ্রিয়তার মূল কারণ ছিল মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। তিনি দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার নেতা ছিলেন। দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অসহায়দের সহযোগিতা করা, বিপদে-আপদে মানুষের খোঁজ নেওয়া ছিল তাঁর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং পরিবারের একজন সদস্যের মতো তিনি মানুষের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতেন।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র হিসেবে কামরান যে দায়িত্ব পালন করেছেন, তা সিলেটের নগর উন্নয়নের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
তাঁর সময়েই নগরীর অবকাঠামোগত উন্নয়ন নতুন গতি লাভ করে। রাস্তা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। সিলেটকে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন তিনি দেখতেন এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তাঁর নেতৃত্বে সিলেট সিটি কর্পোরেশন শুধু একটি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল জনগণের আস্থার কেন্দ্র।
কামরান ভাইয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর মানবিকতা। রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য তাঁর কাছে কখনো মানবিক সম্পর্কের বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।
সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রবাসী সমাজ—সবাই তাঁকে আপন মানুষ মনে করতেন। যে কোনো অনুষ্ঠান, সামাজিক উদ্যোগ কিংবা মানবিক সংকটে তাঁর উপস্থিতি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। মানুষের প্রতি এই দায়বদ্ধতাই তাঁকে সাধারণ রাজনীতিবিদদের চেয়ে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
করোনা মহামারিতে এক অমর আত্মত্যাগ
২০২০ সালে যখন বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল, তখন অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ঘরে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু কামরান ভাই মানুষের পাশে থাকার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াননি।
জনগণের খোঁজখবর নেওয়া, ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং মানবিক সহায়তায় তিনি সক্রিয় ছিলেন। অবশেষে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২০২০ সালের ১৫ জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর মৃত্যু শুধু আওয়ামী লীগের নয়, পুরো সিলেটের জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে সেদিন সিলেটের মানুষ একজন অভিভাবক হারানোর শোক অনুভব করেছিল।
একজন নেতার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তাঁর মৃত্যুর পর মানুষের স্মৃতিতে তাঁর অবস্থান দিয়ে। ছয় বছর পরও বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে সিলেটের মানুষ যেভাবে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণ করে, তা প্রমাণ করে তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানুষের নেতা, হৃদয়ের নেতা।
সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছু পরিবর্তিত হয়, কিন্তু কিছু মানুষের অবদান ইতিহাসের পাতায় নয়, মানুষের হৃদয়ে লেখা থাকে। কামরান ভাই তেমনই একজন মানুষ, যাঁর কর্ম, সততা, মানবিকতা ও জনসেবার আদর্শ আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে।
আজ তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি এই জননেতাকে। আমার জন্মদিনের আনন্দকে যে মানুষটির স্মৃতি প্রতি বছর বেদনাময় করে তোলে, সেই প্রিয় কামরান ভাইয়ের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও অফুরন্ত ভালোবাসা।
মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে দোয়া করি—আল্লাহ পাক মরহুম বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের সকল ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।
