ট্রাম্পের ঘোষণার পরও হামলার মুখে লেবানন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ঃ

 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইসরায়েল ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ পারস্পরিক হামলা বন্ধে সম্মত হয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ও হিজবুল্লাহর পাল্টা আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে চলমান আলোচনা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

গত সোমবার নিজের সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প জানান, তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং ‘উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের’ মাধ্যমে হিজবুল্লাহর সঙ্গেও যোগাযোগ হয়েছে। তার দাবি, উভয় পক্ষই গুলি বিনিময় বন্ধে সম্মত হয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, তিনি নেতানিয়াহুকে বৈরুতের দিকে অগ্রসরমান সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন এবং আশ্বাস পেয়েছেন যে ইসরায়েলি বাহিনী রাজধানীর দিকে অগ্রসর হবে না। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, হিজবুল্লাহও হামলা বন্ধে রাজি হয়েছে।

তবে পরে নেতানিয়াহু বলেন, হিজবুল্লাহর হামলা অব্যাহত থাকলে ইসরায়েল বৈরুতসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে দ্বিধা করবে না। তিনি জানান, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান পরিকল্পনা অনুযায়ী চলবে।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে কোনো যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতার অন্যতম শর্ত হলো লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করে।

এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতির পর হিজবুল্লাহ নতুন করে ইসরায়েলে হামলা চালায়নি, যদিও ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই ওই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে লেবাননে আক্রমণ চালিয়ে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

মার্চের শুরু থেকে ইসরায়েল লেবাননে প্রায় প্রতিদিন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং দেশটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা কার্যত তাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৩ হাজার ৪৩৩ জন নিহত এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। সংঘাতের কারণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

ওয়াশিংটনে লেবাননের দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হিজবুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, ইসরায়েল বৈরুত ও তার দক্ষিণ উপশহরে হামলা বন্ধ করবে এবং বিনিময়ে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমণ থেকে বিরত থাকবে। বিবৃতিতে বলা হয়, পরবর্তীতে এই কাঠামো পুরো লেবাননজুড়ে সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।

হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ নেতা ও সংসদ সদস্য হাসান ফাদলাল্লাহ বলেছেন, সংগঠনটি লেবাননের পুরো ভূখণ্ডে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতির পক্ষে। তার ভাষ্য, যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ হবে লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার।

লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার ও হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ মিত্র নাবিহ বেরি দাবি করেন, হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে প্রস্তুত। তবে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইসরায়েলকে আগ্রাসন বন্ধ করতে কে বাধ্য করবে।

ট্রাম্পের ঘোষণার পর মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত বৈরুতে নতুন কোনো বড় ইসরায়েলি হামলার খবর পাওয়া যায়নি। তবে দক্ষিণ লেবাননে গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী নাবাতিয়েহ, শোকিন ও কাফর তিবনিতসহ বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা নাবাতিয়েহ অঞ্চলে একটি ইসরায়েলি ট্যাংক লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

ইসরায়েলি সামরিক মুখপাত্র আভিখাই আদরাই নাবাতিয়েহ শহরের বাসিন্দাদের জরুরি ভিত্তিতে জাহরানি নদীর উত্তরে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি দাবি করেন, হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় ইসরায়েল ‘বাধ্য হয়ে’ সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে টেলিফোন আলাপ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্রের দাবি, ট্রাম্প ইসরায়েলের পরিকল্পিত অভিযান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং তা ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনাকে বিপর্যস্ত করতে পারে বলে উদ্বেগ জানান। পরবর্তীতে ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।

সোমবার ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানায়, লেবানন ও গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকায় তেহরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান স্থগিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় সামরিক অভিযান বন্ধ এবং লেবাননের দখলকৃত এলাকা থেকে ইসরায়েলের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা এগোবে না।

তবে মঙ্গলবার আধা-সরকারি মেহর সংবাদ সংস্থা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে ইরানের চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তাব এখনও তেহরানে পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে এবং কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব এখনও মধ্যস্থতাকারীদের কাছে পাঠানো হয়নি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিজ্ঞতার কারণে ইরান অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং যেকোনো চুক্তি থেকে ‘বাস্তব ও স্পষ্ট সুবিধা’ নিশ্চিত করতে চায়। একটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, আলোচনার প্রক্রিয়া আবারও স্বাভাবিক গতিতে ফিরেছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি যদি কার্যকর থাকে, তবে তা লেবাননসহ সব ফ্রন্টে কার্যকর হতে হবে। তার ভাষ্য, একটি ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন মানে সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন।

ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও একই অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে তেহরান শুধু আলোচনা বন্ধ করবে না, বরং সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানাতেও প্রস্তুত থাকবে।

গালিবাফ লেবাননের স্পিকার নাবিহ বেরির সঙ্গে এক আলাপে বলেন, ‘যদি লেবাননে জায়নবাদী শাসনের অপরাধ অব্যাহত থাকে, আমরা শুধু আলোচনা স্থগিত করব না, বরং সরাসরি শত্রুর মুখোমুখি হব।’

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)ও সতর্ক করে বলেছে, লেবানন ও গাজায় ‘লাল রেখা’ অতিক্রম করা হলে নতুন ফ্রন্ট খুলে দেওয়া হতে পারে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ না হলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার কৌশল অব্যাহত থাকতে পারে।

ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কার্যকর ও বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, শুধু উদ্বেগ প্রকাশ যথেষ্ট নয়; ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি একটি ফোনকলেই বৈরুতের ওপর সম্ভাব্য বড় হামলা বন্ধ করা যায়, তবে মাসের পর মাস যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন ও আগ্রাসন কেন চলতে দেওয়া হলো?

ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো বলেছেন, লেবাননের অভ্যন্তরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান ও চলমান সামরিক অভিযান কোনোভাবেই ন্যায্যতা পেতে পারে না। তিনি দ্রুত উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানান।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে রাতের অন্ধকারে হিজবুল্লাহর ফার্স্ট-পার্সন-ভিউ (এফপিভি) ড্রোন হামলা ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলায় ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর দেশটির সেনাবাহিনী তদন্ত শুরু করেছে। সামরিক কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, হিজবুল্লাহ তাপ-সংবেদনশীল প্রযুক্তিসম্পন্ন ফাইবার-অপটিক ড্রোন ব্যবহার শুরু করলে রাতের অভিযানে তাদের সক্ষমতা আরও বাড়বে।

উত্তেজনার মধ্যেও ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার বিষয়ে একটি সমঝোতা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই সম্ভব হতে পারে। তিনি দাবি করেন, ইরান একটি চুক্তি করতে চায় এবং আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান সম্ভব। তবে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা, হিজবুল্লাহর পাল্টা আক্রমণ, ইরানের কঠোর অবস্থান এবং চলমান কূটনৈতিক দরকষাকষির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

এ বিভাগের অন্যান্য