যে কারণে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট হতে রাজি হননি আইনস্টাইন
১৯৫২ সাল। সদ্য স্বাধীন হওয়া ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের প্রথম প্রেসিডেন্ট খাইম ভাইৎসম্যানের মৃত্যুর পর বিশ্বজুড়ে তোলপাড়।
বেন-গুরিয়নের নজর পড়েছিল শতাব্দীর সেরা বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের ওপর। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেই প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই পদার্থবিজ্ঞানী।
তার মৃত্যুর পর বেন-গুরিয়নের সরকার আবারও এমন একজন বিশিষ্ট ইহুদি বিজ্ঞানীকে খুঁজছিল, যিনি নতুন রাষ্ট্রে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিদের অভিবাসনকে উৎসাহিত করতে পারবেন।
বিবিসি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত তৎকালীন ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত আব্বা ইবনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বেন-গুরিয়নের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র যখন আইনস্টাইনের কাছে পৌঁছায়, তখন তিনি নিউ জার্সির প্রিন্সটনে গবেষণায় ব্যস্ত।
প্রস্তাবটি পেয়ে আইনস্টাইন গভীরভাবে অভিভূত হলেও তা গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি সারা জীবন বস্তুনিষ্ঠ (বৈজ্ঞানিক) সমস্যা নিয়ে কাজ করেছি। তাই মানুষের সঙ্গে যথাযথভাবে আচরণ করার কিংবা রাষ্ট্রীয় দপ্তরের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সহজাত দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা আমার নেই।
আইনস্টাইন প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পেয়েছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নই। আইনস্টাইনকে প্রস্তাব দেওয়াটা ছিল একপ্রকার রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। তবে বেন-গুরিয়ন মনে মনে বেশ চিন্তিত ছিলেন। তিনি তার চিফ অফ স্টাফকে বলেছিলেন, ‘আইনস্টাইন যদি রাজি হয়ে যান, তবে আমরা বড় সমস্যায় পড়ব।’
বেন-গুরিয়নের ভয় ছিল, রাজনৈতিক বিষয়ে আইনস্টাইনের স্বাধীন, দুঃসাহসী ও আদর্শবাদী চিন্তাভাবনা হয়তো সরকারের নিজস্ব নীতির বিরুদ্ধে কাজ করতে তাকে বাধ্য করবে।
বিবিসির তথ্য মতে, আইনস্টাইন জায়নবাদের সমর্থক ছিলেন এবং ১৯২১ সাল থেকে প্রথম প্রেসিডেন্ট ভাইৎসম্যানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তবে তার রাজনৈতিক অবস্থান ছিল মূলধারার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আইনস্টাইন এমন এক উদারপন্থী জায়নবাদের পক্ষে ছিলেন, যা ফিলিস্তিনে আরব এবং ইহুদি—উভয় জাতির সমান অধিকার নিশ্চিত করে একটি যৌথ বা ‘দ্বি-জাতীয় রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার কথা বলত।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের পর দেশটির কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি। বিশেষ করে মেনাখেম বেগিনের (যিনি পরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হন) নেতৃত্বাধীন ‘হারুত’ দলের সন্ত্রাসী ও সহিংস কার্যকলাপকে আইনস্টাইন এবং অন্য ইহুদি বুদ্ধিজীবীরা নিউ ইয়র্ক টাইমসে লেখা এক খোলা চিঠিতে ‘নাৎসি ও ফ্যাসিবাদী’ ঘরানার বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের চেয়ে বিশ্বজনীন মানবিক বন্ধন এবং আন্তর্জাতিকতাবাদই ছিল আইনস্টাইনের মূল দর্শন।
আইনস্টাইন প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পর ইতিহাসবিদ আইজ্যাক বেন-জেভি ইসরায়েলের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট হন। অন্যদিকে, আইনস্টাইন যে মেনাখেম বেগিনের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, তার দল ‘হারুত’ পরবর্তীতে ডানপন্থী দল ‘লিকুদ’-এ রূপান্তরিত হয়। এই লিকুদ পার্টির বর্তমান নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যিনি ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী।
ইতিহাসবিদদের মতে, আইনস্টাইন যে বহু-সাংস্কৃতিক ও সহাবস্থানের ইসরায়েলের স্বপ্ন দেখতেন, বর্তমান ডানপন্থী রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই ভিন্নমতের আর কোনো স্থান নেই। বিজ্ঞান ও মানবতার এই মহান দূত সেদিন রাষ্ট্রক্ষমতার লোভ লালসা থেকে দূরে থেকে নিজের আদর্শ ও সীমাবদ্ধতা বজায় রাখার যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা আজও ইতিহাসের পাতায় এক বিস্ময়কর অধ্যায় হয়ে আছে।
