সরকার বলছে সংকট নেই অথচ পাম্পে দীর্ঘ লাইন

সিলেটের সময় ডেস্ক :

 

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে বাংলাদেশে স্বস্তি তৈরি হয়েছিল, সেই স্বস্তি আবার উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। কারণ যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ফের হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়েছে। এখনও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ¦ালানি তেল বা এলএনজিবাহী জাহাজ পার হতে পারছে না। ফের পুরোদমে যুদ্ধ লেগে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে এক চিলতে আশার আলো নিভে যেতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে জালানি তেলের পর্যাপ্ত মুজদ রয়েছে। কোনো সংকট নেই। অথচ তেলের পাম্পগুলোতে ভিড় বাড়ছে, দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে লাইন। কবে নাগাদ তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, স্বস্তি ফিরবে পুরোপুরি এ প্রসঙ্গে জ¦ালানি বিভাগের মুখপাত্র যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেছেন, জ¦ালানি তেল আমদানি অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর দু-একটি তেলবাহী জাহাজ হরমুজমুখী হলেও ফের যুদ্ধের আশঙ্কায় সেগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে। জ¦ালানি তেলের স্বাভাবিক সরবরাহের ক্ষেত্রে যুদ্ধ অবশ্যই একটি প্রতিবন্ধকতা। শুধু আমাদের জন্যই না, সারা পৃথিবীর জন্যই। এখন আমাদের অভ্যন্তরীণ মজুদদারদের ঠেকানো একটি বড় কাজ হয়ে দেখা দিয়েছে।

জালানি মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্রিফে তিনি বলেন, অভিযান চালিয়ে অবৈধ মজুদ ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৪২ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা জ¦ালানি তেল স্থানীয় এলাকায় ঘোষণা দিয়ে বিক্রি করা হয়। সরকারের কাছে জ্বালানি তেলের মজুদের পরিমাণও যথেষ্ট। মজুদ ঠেকাতে তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছুটা রাশ টানা হয়েছে।

যুগ্ম সচিব বলেন, এ পর্যন্ত মোট ৭ হাজার ৩৪২টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। মামলার সংখ্যা ৩ হাজার ১১। জরিমানা করা হয়েছে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৮৪ হাজার ৩৫০ টাকা। ৩৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মজুদের পরিমাণ ডিজেল এক লাখ ৪৩ হাজার ১৪৩ টন, অকটেন ৪ হাজার ৫৬৯ টন এবং পেট্রল ১৬ হাজার ৮১২ টন। নিয়মিত আমদানি ও সরবরাহ অব্যাহত থাকায় অন্তত আগামী দুই মাস অকটেন ও পেট্রলের সংকট হবে না।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও প্রকৃত মূল্য অন্তত ১৫৫ টাকা হওয়া উচিত। এ কারণে সরকারকে প্রতি মাসে আড়াই থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বহন করতে হচ্ছে। তবে চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, দেশে জ্বালানি সংকট নেই। অযথা মজুদ করার বা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি সংগ্রহ করলেই নিয়মিত সরবরাহ পাওয়া যাবে। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত সরবরাহ অব্যাহত থাকলে ধীরে ধীরে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে এবং ভোক্তাদের দুর্ভোগ কমে আসবে।

তবে রাজধানীজুড়ে দেখা গেছে প্রায় সব পেট্রলপাম্পেই গাড়ির দীর্ঘ লাইন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে তেল সংগ্রহ করতে দেখা হচ্ছে। তেল না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভও রয়েছে। শুধু পেট্রলপাম্পই নয়, অধিকাংশ বেসরকারি শিল্প-কারখানার মালিকদেরও জ¦ালানি তেল পেতে বেগ পোহাতে হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী জ¦ালানি তেল মিলছে না।

বিপিসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, আমাদের কাছে এবং তিনটি তেল বিতরণকারী কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাছে প্রতিনিয়ত শত শত শিল্প-কারখানার মালিকরা তেলের জন্য চাহিদাপত্র দিচ্ছে। সেগুলো বিবেচনা করে অনেক ক্ষেত্রে কিছুটা কমিয়ে সরবরাহ করা হচ্ছে।

ফুয়েল পাস : মজুদদারি ঠেকাতে কিউআর কোডে পরীক্ষামূলক ফুয়েল পাস চালু করা হয়েছে। জ্বালানি বিতরণে শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই মোবাইল অ্যাপভিত্তিক এই ফুয়েল পাস। জ¦ালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমে কিউআর কোডের মাধ্যমে জ্বালানি নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর দুটি ফিলিং স্টেশনে এই সেবা চালু করা হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ জানায়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের উদ্যোগে তৈরি এই অ্যাপটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

যেভাবে কাজ করবে ফুয়েল পাস : এই ব্যবস্থায় প্রত্যেক ব্যবহারকারীর জন্য একটি কিউআর কোড তৈরি হবে। ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি নেওয়ার সময় কোড স্ক্যান করলেই নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি নেওয়া যাবে। ফিলিং স্টেশন মালিকরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে জ্বালানির বরাদ্দ নথিভুক্ত করবেন। চালকরা কিউআর কোড স্ক্যান করে জ্বালানি গ্রহণ ও নিজেদের বরাদ্দ দেখতে পারবেন। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে সমগ্র দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। এ ছাড়া যাদের স্মার্টফোন নেই, তারা ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে কিউআর কোড ডাউনলোড করে প্রিন্ট ব্যবহার করতে পারবেন।

বিআরটিএ ডাটাবেসের সঙ্গে সংযোগ : নতুন এই ব্যবস্থাটি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ফলে যানবাহনভিত্তিক তথ্য যাচাই সহজ হবে এবং জ্বালানি বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বচ্ছতা বাড়বে অপচয় কমবে : জ্বালানি বিভাগ আশা করছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে, অনিয়ম ও অপচয় কমবে এবং সংকটের সময় কার্যকর ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে।

এদিকে গতকাল ২৫ হাজার টন ফার্নেস তেল নিয়ে এমটি ইস্টার্ন কুইন্স নামের একটি জাহাজ গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। তেল সরবরাহ করেছে ইন্দোনেশিয়ার কোম্পানি পিটি বুমি সিয়াক পুসাকো জাপিন।

২৪ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ :

ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের জরুরি পাইপলাইন স্থানান্তর কাজের কারণে রাজধানীর আশুলিয়া ও সাভারসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় টানা ২৪ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায় আজ ১০ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে ১১ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত এ গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় আশুলিয়া টিবিএস থেকে বাইপাইল পর্যন্ত সড়কের উভয় পাশের এলাকা, ঢাকা ইপিজেড, মালঞ্চ পাওয়ার প্ল্যান্ট, বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স, কাশিমপুর, সারদাগঞ্জ, হাজী মার্কেট, শ্রীপুর, চন্দ্রা, নবীনগর, সাভার টাউন, সাভার ক্যান্টনমেন্ট, উলাইল, ব্যাংক টাউন, সাভার রেডিও কলোনি, কলমা, দোসাইদ, কুমকুমারী, আক্রান, চারাবাগ, বড় আশুলিয়া, টঙ্গাবাড়ি, কাঠগড়া, জিরাবো, গাজীরচট, নয়াপাড়া, দেওয়ান ইদ্রিস সড়কের আশপাশ, নয়ারহাট, বলিভদ্রপুর, পল্লীবিদ্যুৎ, ডেন্দ্রারবর, ভাদাইল ও লতিফপুরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় সব শ্রেণির গ্রাহকের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া এসব এলাকার আশপাশে গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করতে পারে বলেও জানানো হয়েছে। পাইপলাইন স্থানান্তর কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে তিতাস। সাময়িক এ অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।

এ বিভাগের অন্যান্য