ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকিতে জাতীয় গ্রিড
সিলেটের সময় ডেস্ক :
বিদ্যমান বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাপক ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি রয়েছে। কারিগরি সংস্কার ছাড়া ভবিষ্যতে জাতীয় গ্রিডের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না। এ অবস্থায় জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডকে ভবিষ্যতের জন্য নিরাপদ রাখতে বড় ধরনের কারিগরি সংস্কারের সুপারিশ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি। কমিটির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎসহ ইনভার্টারভিত্তিক (আইবিআর) বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়লে বর্তমান গ্রিড পরিচালনা ব্যবস্থায় নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হলে মুহূর্তের মধ্যে ফ্রিকোয়েন্সি বিপজ্জনকভাবে নেমে যেতে পারে, এমনকি প্রচলিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কাজ করার আগেই সিস্টেম বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ফ্রিকোয়েন্সি রেসপন্স, ব্ল্যাক স্টার্ট, দ্রুত রিয়্যাক্টিভ পাওয়ার এবং বিতরণ পর্যায়ে লোড শিফটিং বা পিক শেডিং এই চার ধরনের নতুন অ্যানসিলারি সার্ভিস চালুর সুপারিশ করেছে কমিটি।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগের গঠিত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব সুপারিশ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে গঠিত অ্যানসিলারি ট্যারিফ পর্যালোচনা সংক্রান্ত একটি কমিটি এই সুপারিশ করেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) কেএম আলী রেজাকে আহ্বায়ক করে ১০ সদস্যর একটি কমিটি গঠিত হয়। সেই কমিটিতে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির প্রতিনিধিরা ছিলেন।
জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য করতে একাধিক নতুন কারিগরি সহায়ক সেবা অ্যানসিলারি সার্ভিস চালুর সুপারিশ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগের গঠিত
একটি কারিগরি কমিটি। কমিটির মতে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্তমান গ্রিড পরিচালনায় নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয় বা ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত সহায়ক সেবাগুলো বাস্তবায়ন হলে জাতীয় গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ও ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে, সিস্টেম লস ও ওভারলোডিং কমবে এবং ব্যয়বহুল পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিদ্যমান ব্যবস্থায় কী রয়েছে : প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ গ্রিড কোড-২০২৩ এবং বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পিপিএ অনুযায়ী কিছু অ্যানসিলারি সার্ভিস বাধ্যতামূলক রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কেন্দ্রগুলোকে গ্রিডে ভোল্টেজ স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন অনুযায়ী রিয়্যাক্টিভ পাওয়ার (ভিএআর) সরবরাহ বা শোষণ করতে হয়। এ ছাড়া ফ্রি গভর্নর মোড অপারেশন (এফজিএমও) এবং অটোমেটিক জেনারেশন কন্ট্রোল (এজিসি) ব্যবহার করে ফ্রিকোয়েন্সি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হয়। গ্রিড অপারেটরকে উৎপাদন সক্ষমতার সঠিক তথ্যও দিতে হয়, যাতে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিকল্পনা করা যায়।
অন্যদিকে বিতরণ কোম্পানি ও বড় শিল্প গ্রাহকদের নির্ধারিত সীমার মধ্যে পাওয়ার ফ্যাক্টর বজায় রাখা, নেটওয়ার্কের ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুতের চাহিদার নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
কেন নতুন ব্যবস্থা প্রয়োজন : কমিটির ভাষ্য, ভবিষ্যতে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো ইনভার্টারভিত্তিক (আইবিআর) বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়বে। একই সঙ্গে এইচভিডিসি সংযোগও বৃদ্ধি পাবে। এতে জাতীয় গ্রিডের স্বাভাবিক জড়তা (সিস্টেম ইন্টেরিয়া) কমে যেতে পারে। ফলে বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হলে খুব দ্রুত ফ্রিকোয়েন্সি নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং প্রচলিত গভর্নর ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার আগেই সিস্টেম বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছাতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি নতুন অ্যানসিলারি সার্ভিস চালুর সুপারিশ করেছে কমিটি।
দ্রুত ফ্রিকোয়েন্সি প্রতিক্রিয়া : প্রতিবেদনে দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল ফ্রিকোয়েন্সি অ্যানসিলারি সার্ভিস (ফাস্ট ফ্রিকোয়েন্সি রেসপন্স) চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ বা শোষণ করে ফ্রিকোয়েন্সির আকস্মিক পতন ঠেকানো যাবে। এতে বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঝুঁকি কমবে এবং গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
ব্ল্যাকআউটের পর দ্রুত বিদ্যুৎ ফেরাতে ব্ল্যাক স্টার্ট : জাতীয় গ্রিড সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন হয়ে গেলে বাহ্যিক বিদ্যুৎ ছাড়াই ধাপে ধাপে গ্রিড চালু করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্ল্যাক স্টার্ট সক্ষমতা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটির মতে, গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে এই সক্ষমতা থাকলে বড় ধরনের ব্ল্যাকআউটের পর দ্রুত ও নিরাপদে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে। এতে জাতীয় গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত রিয়্যাক্টিভ পাওয়ার : কমিটি দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল রিয়্যাক্টিভ পাওয়ার অ্যানসিলারি সার্ভিস চালুরও সুপারিশ করেছে। ফল্ট বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে হঠাৎ রিয়্যাক্টিভ পাওয়ারের চাহিদা বেড়ে গেলে ভোল্টেজ দ্রুত কমে যায় এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়।
এ সমস্যা মোকাবিলায় গ্রিড-ফর্মিং ও গ্রিড-ফলোয়িং ইনভার্টার প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত রিয়্যাক্টিভ পাওয়ার সরবরাহ, স্বয়ংক্রিয় ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ (এভিআর) এবং ফল্ট চলাকালে অতিরিক্ত রিয়্যাক্টিভ কারেন্ট সরবরাহের সক্ষমতা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বিশেষ করে দুর্বল সঞ্চালন লাইনে সংযুক্ত বৃহৎ সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সৃষ্ট ভোল্টেজ অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর জন্য লোড শিফটিং : বিতরণ ব্যবস্থার জন্য লোড শিফটিং বা পিক শেডিং অ্যানসিলারি সার্ভিস চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাপ কমিয়ে ব্যয়বহুল পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার হ্রাস করা যাবে। পাশাপাশি ট্রান্সফরমার ও সঞ্চালন লাইনের অতিরিক্ত চাপও কমানো সম্ভব হবে।
কার কী দায়িত্ব : কমিটির প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও স্পষ্ট করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রিডে প্রয়োজন অনুযায়ী রিয়্যাক্টিভ পাওয়ার সরবরাহ, ফ্রি গভর্নর মোড ও অটোমেটিক জেনারেশন কন্ট্রোল কার্যকর রাখা, উৎপাদন সক্ষমতার সঠিক তথ্য প্রদান এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ফ্রিকোয়েন্সি প্রতিক্রিয়া ও ব্ল্যাক স্টার্ট সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ (পিজিসিবি) বা গ্রিড অপারেটরকে ফ্রিকোয়েন্সি, ভোল্টেজ ও সিস্টেম রিজার্ভ কার্যকরভাবে পরিচালনা, উৎপাদন ও চাহিদার সমন্বয় নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ গ্রিডের চাহিদা অনুযায়ী নতুন অ্যানসিলারি সার্ভিস বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বিতরণ কোম্পানিগুলোকে নির্ধারিত পাওয়ার ফ্যাক্টর বজায় রাখা, নেটওয়ার্কের ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ, সঠিক বিদ্যুৎ চাহিদার পূর্বাভাস প্রদান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী লোড শিফটিং বা পিক শেডিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
আলাদা অ্যানসিলারি সার্ভিস বাজারের প্রস্তাব : কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বিশ্বের অনেক দেশে অ্যানসিলারি সার্ভিসের জন্য পৃথক বাজার (অ্যানসিলারি সার্ভিস মার্কেট) রয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের বাজার চালু করা উপযোগী হবে কিনা, তা আন্তর্জাতিক মানের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত। এ লক্ষ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে অথবা উন্নয়ন সহযোগীদের কারিগরি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের সুপারিশ করেছে কমিটি।
