ডিএসইতে সুশাসনের সংকট, অনিয়মে ক্ষোভ
সিলেটের সময় ডেস্ক :
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) করপোরেট সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাই, নতুন নিয়োগ, পদোন্নতি এবং বেতন-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে নীতিমালা লঙ্ঘন, স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদনও করেছেন চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের প্রধান শেয়ারবাজার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়ে এমন বিতর্ক শুধু ডিএসইর ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন করবে না, বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডিএসইর বর্তমান প্রশাসনের বেশকিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে করপোরেট সুশাসন ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে কোনো ধরনের যৌক্তিক কারণ ছাড়াই দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অন্যায়ভাবে ছাঁটাই করা হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রচলিত নিয়ম ও নীতিমালার তোয়াক্কা না করে পছন্দের ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার মচ্ছব চলছে।
ডিএসইর ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, বর্তমান প্রশাসনের এই পক্ষপাতমূলক ও খামখেয়ালি আচরণে প্রতিষ্ঠানের কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়ন করে অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নিয়োগ বাণিজ্য চালানো হচ্ছে, যা পুঁজিবাজারের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতাকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলছে। দীর্ঘদিন ধরে চেপে রাখা এই ক্ষোভ এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।
পুঁজিবাজারের শৃঙ্খলা ও ডিএসইর ভাবমূর্তি রক্ষার্থে এই অনিয়ম ও দুর্নীতির অবসান চান সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরই ধারাবাহিকতায়, ছাঁটাই ও নিয়োগের সার্বিক অনিয়ম খতিয়ে দেখতে বিএসইসির হস্তক্ষেপ কামনা করে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি জানানো হয়েছে।
তাদের দাবি, অনুমোদিত পুনর্গঠন পরিকল্পনা ছাড়াই তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা লঙ্ঘন, স্বজনপ্রীতি ও অস্বচ্ছতা হয়েছে। গত ২৮ জুন বিএসইসির চেয়ারম্যানের কাছে যৌথ আবেদন করেন ডিএসইর সাবেক তিন ডিজিএম মো. আব্দুর রাজ্জাক, মো. শাহীন সারওয়ার হোসেন ও মো. আব্দুল লতিফ।
আবেদনে বলা হয়, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অসদাচরণ, কর্মদক্ষতার ঘাটতি বা শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ ছিল না। তবু গত ২৫ জুন কোনো অনুমোদিত পুনর্গঠন পরিকল্পনা বা সংশোধিত অর্গানোগ্রাম ছাড়াই তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়।
আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, নোটিশ পিরিয়ড অনুসরণ না করে ১২০ দিনের গ্রস বেতন পরিশোধের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই দিনে তাদের কর্মস্থল ছাড়তে বাধ্য এবং কম্পিউটার, ই-মেইল ও অন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকারও বন্ধ করে দেওয়া হয়। তিন কর্মকর্তার বিষয়ে বিএসইসির কাছে ডিএসইর পুনর্গঠন-সংক্রান্ত বোর্ডের সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট নথি তলব, চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখা, পুনর্বহাল এবং পুরো প্রক্রিয়ার স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
একই আবেদনে ডিএসইর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও অতিরিক্ত ক্যারিয়ার সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। তাদের দাবি, কয়েকটি নিয়োগে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। আবার কয়েকটি পদোন্নতি অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম ও নমিনেশন অ্যান্ড রেমুনারেশন কমিটির (এনআরসি) সুপারিশ ছাড়াই দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত চেয়েছেন আবেদনকারীরা।
আবেদনকারীদের ভাষ্য, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং ডিএসইর করপোরেট সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাদের মতে, দেশের প্রধান পুঁজিবাজার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও জনবল ব্যবস্থাপনায় নীতিমালা উপেক্ষা করা হলে তা বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে পদোন্নতি ও নিয়োগে অনিয়ম নিয়েও ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে কর্মকর্তাদের মধ্যে। ২০১০ সালে যোগদানের পর একের পর এক বিদেশ সফর, দ্রুত প্রমোশন, নিয়ম ডিঙিয়ে বেতন বৃদ্ধি ও বাড়তি ইনক্রিমেন্ট সুবিধা ভোগ করেছেন ডিএসইর বর্তমান প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মোহাম্মাদ আসাদুর রহমান। শুধু তাই নয়, যার হাত ধরে প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন, তাকেই সরিয়ে একপর্যায়ে কোম্পানি সেক্রেটারির চেয়ার দখল করেন। সর্বশেষ কোনো বিজ্ঞাপন ছাড়াই প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ (সিওও) বাগিয়ে নেন, যার মাসিক বেতন ৫ লাখ টাকা। এর কয়েক সপ্তাহ পার না হতেই রহস্যজনকভাবে তার বেতন আরও ১ লাখ টাকা বাড়িয়ে ৬ লাখ টাকা করা হয়। অন্যদিকে, নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ারের দুই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে উচ্চপদে বসানো হয়েছে। গত ২৪ মে কোনো প্রকার বিজ্ঞপ্তি বা নমিনেশন অ্যান্ড রিমিউনারেশন কমিটির (এনআরসি) অনুমোদন ছাড়াই এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগদান করেছেন মোহাম্মদ রকিবুল হাসান পারভেজ ও পৃথুলা হৃদি। এই নিয়োগের বিষয়ে ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যেও চরম অস্বস্তি বিরাজ করছে।
এর আগে তোয়াক্কা না করে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের একক ইচ্ছায় ডিএসইর মার্কেট ডেভেলপমেন্ট বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. সামিউল ইসলাম এবং কোম্পানি সেক্রেটারি এবং মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মোহাম্মদ আসাদুর রহমানকে সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজারকে (সিনিয়র জিএম) পদোন্নতি দেয়। কিন্তু ডিমিউচুয়ালাইজেশন (স্টক এক্সচেঞ্জের মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা আলাদকরণ) আইনে থাকা জনবল কাঠামো অনুসারে স্টক এক্সচেঞ্জে সিনিয়র জিএম কোনো পদ নেই। নতুন পদ সৃষ্টি করতে হলে প্রথমে বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়। পরে নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু এ ধরনের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে ডিএসইর নিয়ম অনুসারে ডিজিএম পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিতে এনআরসির সুপারিশ লাগে। কমিটি যাচাই-বাচাই করে প্রমোশনের সুপারিশ করে। কিন্তু কাউকে তোয়াক্কা না করে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেয়। আর সিনিয়র জিএম পদোন্নতি সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। এ জন্য পরবর্তী সময়ে তাদের পদাবনতি করা হয়।
ডিএসইর চাকরিচ্যুত ডিজিএম মো. আব্দুল লতিফ আমাদের সময়কে বলেন, আশা প্রত্যাশা বিএসইসি থেকে আমরা ন্যায়বিচার পাব। বিষয়টি কমিশন খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে বলে প্রত্যাশা করছি।
ডিএসইর এমডি নুজহাত আনোয়ার আমাদের সময়কে বলেন, ‘ডিএসই একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। পরিচালনা পর্ষদের নেওয়া সিদ্ধান্তের আলোকেই এই কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ডিএসইর বর্তমান প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) মোহাম্মাদ আসাদুর রহমানের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি।
ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমেদ ইকবাল হাসান আমাদের সময়কে বলেন, ডিএসইতে সুশাসন বলে কিছু আছে বলে মনে হয় না। করপোরেট গভর্ন্যান্সের ন্যূনতম বালাই নেই। তিনি আরও অভিযোগ করেন, একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দেশের এই ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানটিকে কুক্ষিগত করে চালানো হচ্ছে।
