দেশে একদলীয় শাসন কায়েমের চেষ্টা করা হচ্ছে: জামায়াত আমির

সিলেটের সময় ডেস্ক :

 

জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘সরকার ইতোমধ্যে অনেক অঘটন ঘটিয়ে ফেলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিভিন্ন ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে অনুগত ব্যক্তিদের বসানো হচ্ছে এবং এভাবে দেশে একদলীয় শাসন কায়েমের চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু দেশের জনগণ এ একদলীয় শাসন ব্যবস্থা মেনে নেবে না।’

আজ শুক্রবার সকালে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ময়দানে মহানগর জামায়াতে ইসলামীর কর্মী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুল জব্বারকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন।

ডা. শফিকুর রহমান ইতিহাস ভুলে গেলে হবে না, ‘শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবও একদলীয় শাসন কায়েম করেছিলেন, কিন্তু তিনিও সাড়ে তিন বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। সুতরাং একদলীয় শাসন এ দেশের মানুষ মেনে নেবে না। সংসদে দাঁড়িয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার সংস্কৃতি চালু করেছিল আওয়ামী লীগ। সব চেয়ে বেশি গালি দিত বিএনপিকে, সাথে আমাদেরও ছাড়ত না। জনগণ এসব আর খায় না।’

২০২৪-এর আন্দোলন ও বিগত নির্বাচন নিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘এখন আমরা যারা সরকারে আছি এবং বিরোধী দলে যারা আছি, আমাদের মনে রাখতে হবে ২৪ হয়েছিল বলেই ২৬ সালে বাংলাদেশে একটা নির্বাচন হয়েছে। ২৪ যদি না হতো, ২৬ সালে বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল না। তাদের রক্ত এবং ত্যাগের কারণে আজকের এই সংসদ, সরকার, বিরোধী দল। তারা যদি এই সমস্ত শহীদ পরিবার ও আহত পঙ্গু ভাই-বোনদের প্রতি অবজ্ঞা বা উপহাস করেন, তবে এটি নিজের সাথেই গাদ্দারি করার শামিল হবে।’

তিনি বলেন, ‘এই নারায়ণগঞ্জবাসীকে আমরা আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। বিগত নির্বাচনে হাজার জালিয়াতি, সন্ত্রাস, কালো টাকার ছড়াছড়ি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হাজার জাতের মেকানিজম-ইঞ্জিনিয়ারিং, সবকিছুকে উপেক্ষা করে আপনারা ১১ দলীয় ঐক্যকে অন্তত একটি আসন উপহার দিতে পেরেছেন, এজন্য আপনাদের অভিনন্দন।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, নির্বাচন যেভাবে হয়েছিল, ভোট গণনা এবং ফলাফলও যদি সেভাবে সুষ্ঠু হতো, তবে অন্য আসনগুলোতেও অবশ্যই আমাদের বিজয় হতো। সেই বিজয় মূলত ছিনতাই করে নেওয়া হয়েছে। অনেকে আমাদের ওপর অভিমান করে বলেন যে, কেন আমরা এই রায় মেনে নিলাম? আমরা তাদের বলেছি, সাড়ে ১৫ বছর দেশ স্বৈরশাসনের কবলে ছিল, এরপরে একটি নির্বাচন হয়েছে যেখানে জনগণ ভোট দিয়েছে। নির্বাচনের আগে সারাদেশে একই আওয়াজ উঠেছিল ‘‘দাঁড়িপাল্লা, দাঁড়িপাল্লা’’। একদিনে দুটো ভোট হয়েছে- একটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের ভোট, আরেকটি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে গণভোট। আমাদের অবস্থান সুদৃঢ় ছিল, আমাদের মার্কা এবং গণভোটে ‘‘হ্যাঁ’’-এর পক্ষে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার প্রথমে চুপ ছিল। নীরবে নীরবে তারা ‘‘না’’-এর পক্ষে ছিল। এরপর জনরোষের মুখে পড়ে তাদের নেতাও শহিদ আবু সাঈদের এলাকায় গিয়ে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ১২ তারিখ দুটি ভোট- একটি গণভোট আর অন্যটি জাতীয় সংসদের ভোট, আপনারা গণভোটে ‘‘হ্যাঁ’’ ভোট দেবেন। আল্লাহর কসম, একবারই তিনি বলেছেন।’’

তিনি বলেন, ‘সেই গণভোটে যে ৬৬.৮ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিল তাদের ভোটের মূল্যটা তিনি কী দিলেন? বর্তমান সরকার সেই জনরায়কে এখন অস্বীকার করছে। কিন্তু নির্বাচনের পর বর্তমান সরকার এবং তাদের তথাকথিত ‘‘সর্বমন্ত্রী’’ সংসদে দাঁড়িয়ে বলছেন যে, নির্বাচন যাতে হয়ে যায় সেজন্য তারা ওসব কথা বলেছিলেন। যা জনগণের সাথে সরাসরি প্রতারণা। একটা সংগঠনের শীর্ষ জায়গা থেকে যদি জনগণকে এভাবে ধোকা দেওয়া হয়, তাহলে রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে কেন?’

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা সংসদে নোটিশ দিয়েও আলোচনা করেছিলাম যাতে গণভোটকে সম্মান দেখানো হয়। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, যারা জনগণের রায়কে সম্মান করে না, তারা কখনো গণতন্ত্রকামী হতে পারে না। গণতন্ত্রের দাবিই হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়কে সম্মান করা। যেহেতু দেশের প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, তাই সরকারকে সেই সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। তারা ভোটের আগে বলেছিলেন, যেই সরকার গঠন করুক আমরা জনগণের রায় মেনে নেব। আমি এখনো সরকারকে আহ্বান জানাই, সময় আছে ফিরে আসুন। মেনে নিন এবং মানুষের রায়ের প্রতি সম্মান দেখান। জোর করে যদি শাসন ব্যবস্থা চালাতে চান, জনগণ আপনাদের সামনে হিমালয় দাঁড় করিয়ে দেবে।’

তিনি বলেন, ‘একটা বড় বাজেট দেওয়া হয়েছে, অসুবিধা নাই। বাজেট দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের, বাস্তবায়ন করার দায়িত্বও সরকারের। শুধু এতটুকু, বিগত সাড়ে ১৫ বছরে এই বাজেট থেকে যেভাবে আওয়ামী লীগ আর তার দোসররা ২৯ লাখ কোটি টাকা চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল, সেই পথ কি আপনারা আটকাবেন না? আমরা কীভাবে আস্থা রাখব? কারণ, সরকার গঠন করার আগে এবং পরে আপনারা তো চাঁদাবাজদের হাত আটকাইতে পারেন নাই। একটা চাঁদাবাজকেও আপনারা শাস্তির আওতায় আনেন নাই, দুর্নীতি বন্ধ করেন নাই। বরং দুর্নীতির মিটার আগের থেকে আরও বেড়ে গেছে। যদি এই অবস্থা জারি থাকে, তাহলে জনগণ জনগণের জায়গায় থাকবে, তাদের ভাগ্যে কিছুই জুটবে না। শুধু কিছু দলকানা মানুষ এবং কিছু গোষ্ঠীর হয়তো ভাগ্যের পরিবর্তন হবে, বাংলাদেশে আমরা আর এটা দেখতে চাই না।’

নারায়ণগঞ্জ নিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ, এক সময় এটাকে প্রাচ্যের ডান্ডি বলা হতো। এটা ছিল শিল্পের রাজধানী। ঢাকা ছিল প্রশাসনিক রাজধানী, নারায়ণগঞ্জ ছিল শিল্পের রাজধানী, চট্টগ্রাম ছিল রাজধানী। নারায়ণগঞ্জ তার গৌরব হারিয়ে ফেলেছে। বরঞ্চ মাঝখানে এটা সন্ত্রাসের রাজধানী হিসেবে পরিচিত হয়েছে। ত্বকী আপনাদেরই ছেলে, তার হত্যার বিচার কি এই নারায়ণগঞ্জের মানুষ আজ পর্যন্ত পেয়েছে? না পাননি। শুধু কি ত্বকী? এরকম দফায় দফায় দফায় রক্ত আর লাশ এই নারায়ণগঞ্জে উপহার দেওয়া হয়েছে।’

মাওলানা আব্দুল জব্বারের সভাপতিত্বে এসময় উপস্থিত ছিলেন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও এমপি সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির ও এমপি নুরুল ইসলাম বুলবুল ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

এ বিভাগের অন্যান্য