বিশ্বজুড়ে বাড়তে পারে তাপপ্রবাহ, খরা ও খাদ্যসংকট সতর্কতা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ঃ
আগামী মাসগুলোতে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া এবং খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াতে পারে মাঝারি থেকে শক্তিশালী ‘এল নিনো’। এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। সংস্থাটি বলছে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রাকৃতিক এই আবহাওয়াগত প্রক্রিয়ার নতুন পর্যায় শুরু হতে পারে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতোমধ্যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠা পৃথিবীর ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।
মঙ্গলবারবার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
এই প্রতিবেদন অনুযায়ী পূর্বাভাসে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, চলতি বছরের বাকি সময়জুড়ে এল নিনো আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, এটি গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটি হতে পারে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ একে ‘অতিশক্তিশালী এল নিনো’ হিসেবেও আখ্যা দিচ্ছেন।
সংস্থাটির তথ্যমতে, এল নিনো একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যার ফলে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। সাধারণত এই পরিস্থিতি নয় থেকে বারো মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ওপর পড়ে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ পানি এল নিনোর বিকাশকে ত্বরান্বিত করছে। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা থাকার সম্ভাবনা প্রায় ৮০ শতাংশ। এই পরিস্থিতি নভেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে এল নিনো ঠিক কতটা শক্তিশালী হবে, সে বিষয়ে এখনো কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিভিন্ন পূর্বাভাস মডেলে ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে বিজ্ঞানীরা মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের আবহাওয়াগত পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, ‘আমাদের একটি সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এটি খরা ও অতিবৃষ্টির মাত্রা বাড়িয়ে দেবে। একই সঙ্গে স্থলভাগ ও মহাসাগরে তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল, যুক্তরাষ্ট্র, হর্ণ অব আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ায় বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্যদিকে ভারত, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ, অস্ট্রেলিয়া, মধ্য আমেরিকা এবং ইন্দোনেশিয়ায় খরার প্রকোপ দেখা দিতে পারে।
এ ছাড়া মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনাও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সেলেস্তে সাউলো স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া সর্বশেষ শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে ২০২৪ সাল ইতিহাসের উষ্ণতম বছর হিসেবে রেকর্ড গড়েছিল। তিনি বলেন, অতিরিক্ত গরমের কারণে মশাবাহিত রোগের বিস্তার, খাদ্য ও পানির সংকট এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
তার ভাষায়, ‘যেসব জনগোষ্ঠী ইতোমধ্যে জীবনধারণের জন্য সংগ্রাম করছে, তারা আরও কঠিন সংকটের মুখোমুখি হবে।’
এল নিনোর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চকলেট ও কোকো প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ব্যারি ক্যালবটের প্রধান নির্বাহী হাইন শুমাখার সতর্ক করে বলেছেন, পশ্চিম আফ্রিকা ও ইকুয়েডরের কোকো উৎপাদনকারী অঞ্চলে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি খুব সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। এল নিনোর প্রভাবে কোকোর দাম প্রতি টনে কয়েক হাজার পাউন্ড পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।’
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে অস্বাভাবিক উষ্ণতার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। সেখানে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সমুদ্রপৃষ্ঠকে আরও উত্তপ্ত করার জন্য একটি বড় তাপভাণ্ডার হিসেবে কাজ করছে।
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই পরিস্থিতিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার জরুরি বার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বের উচিত এটিকে একটি জরুরি জলবায়ু সতর্কতা হিসেবে দেখা। এল নিনো মূলত উষ্ণ হয়ে ওঠা পৃথিবীকে আরও উত্তপ্ত করে তুলবে।’
