রূপপুরে জ্বালানি লোডিং শুরু, পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশ

 

সিলেটের সময় ডেস্ক :

পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে দেশের জ্বালানি খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।

আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এ সময় সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই ধাপে পৌঁছানোকে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অগ্রযাত্রায় একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছিল সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা। সেই ধারাবাহিকতায় আজ জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা বাংলাদেশ ও রাশিয়ার জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে রাশিয়ার সমর্থন এবং পরবর্তী পুনর্গঠনে তাদের সহযোগিতা দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরো দৃঢ় করেছে।’

তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্প দেশের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন।

পারমাণবিক শক্তি ভবিষ্যতে শিল্পায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হবে।’ 

প্রকল্পটির ইতিহাস তুলে ধরে তিনি জানান, ১৯৬১ সালে এর ধারণা আসে এবং বিভিন্ন সময়ে সমীক্ষার পর ১৯৯৫ সালে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে পারমাণবিক প্রযুক্তির ভিত্তি গড়ে ওঠে। রূপপুর প্রকল্পে দুটি ভিভিইআর-১২০০ ইউনিটের মাধ্যমে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, রূপপুর প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দেশীয় সক্ষমতার একটি বাস্তব প্রতিফলন। তিনি বলেন, ধারণা থেকে বাস্তবে রূপ নেওয়ার এই দীর্ঘ যাত্রা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং, তবে একই সঙ্গে শিক্ষণীয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ জ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরো উল্লেখ করেন, রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এই প্রকল্পকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার কারিগরি সহায়তা ও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ প্রকল্পটিকে আরো নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য করেছে।

 

নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—এই তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি তার রেকর্ডকৃত বক্তব্যে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, রূপপুরে জ্বালানি লোডিং একটি বড় অর্জন, যা দেশের জন্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তিনি বলেন, এই সংস্থা শুরু থেকেই বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এবং নিরাপদ ও সুরক্ষিত বাস্তবায়নে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। পারমাণবিক শক্তি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি—এ কথা উল্লেখ করে তিনি ভবিষ্যতেও পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সেই লিখাচেভ বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারকারী দেশের কাতারে যুক্ত হয়েছে। তিনি জানান, মহামারি, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও প্রকল্পের কাজ একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। বর্তমানে প্রকল্পটি সমাপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয় ইউনিটে পাইপলাইন ও পাম্পিং সরঞ্জাম স্থাপনের কাজ চলছে এবং আগামী বছর সেখানে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্পে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বিত কাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

মানবসম্পদ উন্নয়নের দিকেও জোর দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে লিখাচেভ বলেন, রাশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যে ৯০০-এর বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পারমাণবিক বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছে এবং তাদের অনেকেই এই প্রকল্পে কাজ করছেন। মোট ১১০০-এর বেশি দক্ষ জনবল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যারা বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প এখন পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে। পরিকল্পনা, নির্মাণ ও পরীক্ষণের মতো জটিল ধাপ অতিক্রম করে আজকের এই পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। গত এক বছরে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি স্থাপন, নিরাপত্তা যাচাই এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকল্পটি দ্রুত এগিয়েছে।

তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরিতেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি বাংলাদেশের সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও দূরদর্শী পরিকল্পনার প্রতিফলন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে, যা শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যার সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল প্রায় একশ বছর।

জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের মাধ্যমে রূপপুর প্রকল্প এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিকে এগিয়ে গেল। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই অর্জন শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেই নয়, বরং বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেবে।

এ বিভাগের অন্যান্য