হরতাল অবরোধের বাইরে নরম কর্মসূচিতে বিএনপি

সিলেটের সময় ডেস্ক :

 

শুধু হরতাল-অবরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ফাঁকে ফাঁকে নরম কর্মসূচি পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। দলটি সামনের কিছুদিন সমাবেশ ও মানববন্ধনের মতো আরও কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে রাজপথে নামার পথ খুঁজছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী সূত্র থেকে এমন তথ্য জানা গেছে।

বিএনপি ছাড়াও অন্যান্য সমমনা রাজনৈতিক দল এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভাবনা একই। বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২৮ অক্টোবর মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর এ পর্যন্ত ১৮ দিন অবরোধ ও ৪ দিন হরতাল কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। সম্প্রতি দল ও জোটের একাধিক বৈঠকে বিকল্প কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়। সমাবেশ, গণমিছিল, পেশাজীবী সমাবেশ ইত্যাদি নানা কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়। কিন্তু নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার অব্যাহত থাকায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শ্রমিক সমাবেশ শেষে ফেরার পথে কয়েকজন শ্রমিক নেতা আটক হলে নরম কর্মসূচিতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি আরও ঝুলে যায়। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস আগামী ১০ ডিসেম্বর দিনটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এ দিনে টেস্ট কেস হিসেবে ঢাকাসহ সারাদেশে নরম কর্মসূচি করার সিদ্ধান্ত হয়।

গতকাল বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, আগামী ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে গুম, খুন, গায়েবি মামলায় গ্রেপ্তার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়া বিএনপি নেতাকর্মী ও নাগরিকদের পরিবারের সদস্যদের পক্ষে ঢাকাসহ সারাদেশের জেলা সদরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হবে। তবে চলতি সপ্তাহে সরকারের পদত্যাগসহ একদফা ও নির্বাচনের তফসিল বাতিলের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ কর্মসূচিও চলবে। রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আমাদের অবরোধ কর্মসূচি চলছে। একদফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আগামী ৬ ও ৭ ডিসেম্বর অর্থাৎ বুধবার ভোর ৬টা থেকে শুক্রবার ভোর ৬টা পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টার সারাদেশে সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি পালিত হবে।

গত ২৮ অক্টোবর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর থেকে বিএনপি হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দেয়। সর্বশেষ গত রবিবার থেকে নবম দফায় ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ দেয়। যা আজ মঙ্গলবার ভোর ৬টায় শেষ হচ্ছে।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১৮ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। তার আগ পর্যন্ত হরতাল-অবরোধের বাইরে থাকার চেষ্টা করছে দলটি। কিন্তু নেতাকর্মীরা মাঠে নামলে গ্রেপ্তার হচ্ছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবে কর্মসূচি পালন করতে পারছে না তারা। তাই হরতাল-অবরোধের ফাঁকে ফাঁকে অন্য কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে।

গত সাত দিনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিনটি ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর বাইরে দলের ঢাকা মহানগর নেতা এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গেও একাধিকবার বৈঠক করেছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। সব কটি বৈঠকে হরতাল-অবরোধের বিকল্প হিসেবে কী কর্মসূচি দেওয়া যায় তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

দলের কর্ম-কৌশল প্রণয়নে যুক্ত একজন নেতা বলেন, হরতাল-অবরোধ পালনে বিএনপি নেতাকর্মীদের চেয়ে সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা বেশি ছিল। কিন্তু টানা এক মাসের বেশি সময় হরতাল-অবরোধ মানুষকে অভ্যস্ত করে তুলেছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে শৈথিল্য এসেছে। অবরোধে শুধু ঝটিকা মিছিলে রাজনীতিতে তেমন প্রভাবও তৈরি করতে পারছে না। তাই সমাবেশ, মানববন্ধন, গণমিছিলসহ কিছু জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি পালন করছেন তারা। ইতোমধ্যে কারাবন্দি বিএনপি নেতাদের স্বজনদের মানববন্ধন এবং শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত শ্রমিক সমাবেশ শেষে ১২ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আগামী ১০ ডিসেম্বর রবিবার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে ঢাকাসহ সারাদেশের জেলা-মহানগরে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। এই কর্মসূচি ঘিরে সরকার ও প্রশাসন কী ধরনের আচরণ করে তা পর্যবেক্ষণ করবেন দলের নীতিনির্ধারকরা। কর্মসূচিতে তেমন বাধা না এলে রাজপথে নামার মতো আরও কর্মসূচি দেওয়ার বিষয়ে দলের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা আছে।

বৈঠকগুলোর সূত্র থেকে জানা যায়, আগামী সপ্তাহে ঢাকায় পেশাজীবী ও নারী সমাবেশ এবং সারাদেশে গণমিছিলের কর্মসূচি দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এ ছাড়া ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস কীভাবে পালন করা হবে সে বিষয়েও নীতিনির্ধারকদের পরামর্শ নিচ্ছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, আন্দোলন চলাকালে পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশলে পরিবর্তন আনতে হয়। হরতাল-অবরোধ ছাড়াও কর্মসূচি হচ্ছে। কিন্তু পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের সব ধরনের গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনে বাধা দিচ্ছে। সমাবেশ-মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি থেকে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

প্রতীক বরাদ্দপরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা

প্রতীক বরাদ্দের পর আগামী ১৮ ডিসেম্বর থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় বলে মনে করছে বিএনপি। এই সময়ে কীভাবে শক্তভাবে মাঠে থেকে হরতাল-অবরোধ কঠোরভাবে পালন করা যায় সে বিষয়ে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে বিএনপি। যুগপৎ আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গেও বিএনপির আলোচনা হচ্ছে। গত রবিবার দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এবি পার্টির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

ঢাকার নেতারা হরতাল-অবরোধের পক্ষে

ঢাকা মহানগর বিএনপি ও দলের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বরাবরই হরতাল-অবরোধের পক্ষে মত দিচ্ছেন। সম্প্রতি তাদের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের যে কয়টি বৈঠক হয়েছে, সব কটিতে অধিকাংশ নেতা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার বিষয়ে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তারা মনে করেন, অন্য কোনো কর্মসূচি পালনের মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

অবশ্য নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, আপাতত হরতাল-অবরোধে বিরতি দেওয়ার পক্ষে। ৭ জানুয়ারি ভোটে ঠেকানোর কর্মসূচি শক্তভাবে পালন করতে এখন নতুন করে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি প্রয়োজন বলে মত দেন তারা।

এ বিভাগের অন্যান্য