বাবার শেষ বিদায়ে যে কারণে অনুপস্থিত মোজতবা খামেনি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ঃ
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নেমেছে। রাজধানী তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত এই শোকানুষ্ঠানে দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব উপস্থিত থাকলেও অনুপস্থিত ছিলেন বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। তার অনুপস্থিতিকে ঘিরে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে ইরানজুড়ে।
রোববারের জানাজায় আলী খামেনির অন্য তিন ছেলে- মাসউদ, মোস্তফা ও মেইসাম উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, বিপ্লবী গার্ডের প্রধান আহমাদ বাহিদিসহ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সামরিক নেতৃত্ব।
মোজতবা খামেনিকে গত মার্চের শুরুতে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলেও এরপর থেকে তিনি জনসমক্ষে আসেননি। বিভিন্ন মহলে ধারণা করা হচ্ছে, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় আলী খামেনি নিহত হওয়ার সময় মোজতবাও আহত হয়েছিলেন। যদিও এ বিষয়ে ইরান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
আলী খামেনি ১৯৮৯ সাল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুক্রবার শুরু হয়েছে। এক সপ্তাহব্যাপী এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইরান ও ইরাকজুড়ে বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ইরানের দাবি, পুরো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এক কোটি ২০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষ অংশ নেবেন।
বর্তমানে আলী খামেনির মরদেহ তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়েছে। সেখানে জানাজার নামাজে ইমামতি করেন ৯৭ বছর বয়সী বিশিষ্ট শিয়া আলেম আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি তাবরিজি। রোববার এ উপলক্ষে ইরানজুড়ে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়।
সোমবার রাজধানী তেহরানে শোকযাত্রার জন্য রোববার রাতেই গ্র্যান্ড মোসাল্লা থেকে মরদেহ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এরপর মঙ্গলবার কোম, বুধবার ইরাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিয়া ধর্মীয় স্থানে এবং বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্মস্থান মাশহাদে দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
পুরো রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আয়োজন করা হলেও মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় তাকে জনসমক্ষে আনা হয়নি।
বর্তমানে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে। যদিও স্থায়ী শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা চলছে, উভয় পক্ষই প্রয়োজনে আবার সামরিক অভিযান শুরুর সতর্কবার্তা দিয়েছে।
শুধু তেহরানের কর্মসূচিতেই এক কোটির বেশি মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ কারণে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ইরান। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে পদদলিত হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কেও সতর্ক করেছে দেশটির সরকারি গণমাধ্যম।
সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, গ্র্যান্ড মোসাল্লা ও আশপাশের অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে চার হাজারের বেশি মানুষ চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। তবে এ ঘটনায় কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, প্রচণ্ড গরমে শোকাহতদের স্বস্তি দিতে কৃত্রিমভাবে পানি ছিটানো হচ্ছে। অসুস্থ হয়ে পড়া কয়েকজনকে স্ট্রেচারে করে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।
খামেনির কফিনের পাশে তার পরিবারের আরও চার সদস্যের কফিন রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় নিহত এসব সদস্যের মধ্যে তার এক বছর বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানিও রয়েছে।
দীর্ঘ ৩৫ বছরের শাসনামলে আলী খামেনি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ নীতি অনুসরণ করেন এবং গাজার হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসেন। তার মৃত্যু এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে ঘিরে ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
