হামিদের ওপর হামলা, নীরব কেন আমরা?
বশির আহমদ জুয়েল
কানাডার মন্ট্রিয়লে বসবাসরত সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার ছোটদেশ গ্রামের সন্তান আব্দুল হামিদ এপ্লুর ওপর সংঘটিত নৃশংস ছুরিকাঘাতের ঘটনা আমাদের সবাইকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ও মর্মাহত করেছে।
গত ৫ জুন শুক্রবার ফুড ডেলিভারির কাজ করার সময় অর্ডারের অপেক্ষায় বসে ছিলেন হামিদ। হঠাৎ পিছন থেকে এক দুর্বৃত্ত অতর্কিতভাবে তার ওপর হামলা চালায়। প্রথমে পিঠে এবং পরে বুকে ছুরিকাঘাত করা হয়। বুকে আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে তা তার ফুসফুস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই হামলার পেছনে কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ, পূর্ব শত্রুতা কিংবা দৃশ্যমান কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। একজন নিরীহ কর্মজীবী অভিবাসী তরুণ, যিনি জীবিকার তাগিদে কঠোর পরিশ্রম করছিলেন, তাকে এভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা সভ্য সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অনেকের ধারণা, এটি একটি সম্ভাব্য হেইট ক্রাইম (ঘৃণাজনিত অপরাধ) হতে পারে। বিষয়টি কানাডার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
আমরা স্বস্তির সঙ্গে জেনেছি যে মন্ট্রিয়ল পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে গ্রেপ্তারই শেষ কথা নয়। এই ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ একজন হামিদের ওপর আঘাত মানে শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়; এটি প্রবাসে নিরাপদ জীবন গড়ার স্বপ্ন নিয়ে আসা হাজারো অভিবাসীর নিরাপত্তাবোধের ওপর আঘাত।
দুঃখজনকভাবে, প্রবাসে কোনো বাংলাদেশি বিপদের মুখে পড়লে আমরা অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহানুভূতির কয়েকটি বাক্য লিখেই দায়িত্ব শেষ করি। কিন্তু বাস্তবে আহত ব্যক্তি ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়। মন্ট্রিয়লে সক্রিয় বাংলাদেশি কমিউনিটি সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী এবং প্রবাসী নেতৃত্বের এখন দায়িত্ব হামিদের খোঁজখবর নেওয়া, প্রয়োজনীয় আইনি ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনাটির সুষ্ঠু বিচার দাবিতে সোচ্চার হওয়া।
আব্দুল হামিদ এপ্লু কোনো পরিসংখ্যান নন, কোনো সংবাদ শিরোনামও নন। তিনি একজন মানুষের সন্তান, একটি পরিবারের স্বপ্ন, একজন পরিশ্রমী তরুণ, যিনি নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে হাজার মাইল দূরে এসে সংগ্রাম করছেন। তার প্রতি সংঘটিত এই বর্বর হামলার বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠে বলতে হবে—ঘৃণা, সহিংসতা ও বর্ণবাদী মানসিকতার কোনো স্থান আমাদের সমাজে নেই।
আমরা হামিদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি এবং কানাডার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানাই।
আজ হামিদ আক্রান্ত হয়েছেন। আগামীকাল যাতে আর কোনো বাংলাদেশি, কোনো অভিবাসী কিংবা কোনো নিরীহ মানুষ এমন হামলার শিকার না হন—সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।
