মসলার বাজারে যুদ্ধের ঝাঁজ

সিলেটের সময় ডেস্ক :

 

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের মসলার বাজারে। জ্বালানি ও আমদানি খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে রকমভেদে কেজি প্রতি মসলার দাম বেড়েছে সর্বনিম্ন ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত! আশঙ্কা করা হচ্ছে, কোরবানির আগেই মসলার দামবৃদ্ধির এ দৌড় আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে। তবে দেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ বাজার খাতুনগঞ্জ ‘ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের’ সহসম্পাদক রেজাউল কবির আজাদ বলেন, ‘দেশে আমদানি করা অনেক মসলা ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আসে। তাই যুদ্ধের কারণে কিছু কিছু মসলার দাম বেড়েছে। তবে খাতুনগঞ্জে মসলার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।

কোরবানিতে মসলার কোনো সংকট হবে না।’ এদিকে মসলার দাম বৃদ্ধির জন্য বাজার কারসাজি সিন্ডিকেটকেই দায়ী করেছেন কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, ‘মসলার দামবৃদ্ধি সম্পূর্ণ বাজার কারসাজি। ব্যবসায়ীরা যুদ্ধের অজুহাতে নিজেদের ইচ্ছামতো মসলার দাম বাড়িয়েছে অতীতের মতো কারসাজি করে। শঙ্কার কথা হচ্ছে কোরবানির আগে তা ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে। তাই বাজার মনিটরিং বৃদ্ধি করতে হবে।’ জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবং লোহিত সাগরকেন্দ্রিক সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে খাতুনগঞ্জের মসলার বাজারে। বিশ্ববাজারে এ পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতকে পুঁজি করে খাতুনগঞ্জের আমদানিকারকরা মসলার দাম তড়িঘড়ি করে বাড়িয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে খাতুনগঞ্জের বাজারে প্রায় প্রতিটি মসলার দাম ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে।

মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে পেস্তাবাদাম ৩ হাজার ১০০ টাকা বিক্রি হলেও দুই সপ্তাহের ব্যবধানে তা কেজিতে ১ হাজার টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ১০০ টাকা। একইভাবে ৫০০ টাকার আলু বোখারা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৩২০ টাকা। কিশমিশ প্রতি কেজিতে ২০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৮২০ টাকা। ইরানি জিরা ১০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৭২০ টাকা। জায়ফল ১৫০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৭২০ টাকা, জয়ত্রি ১০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ টাকা। সবচেয়ে বড় লাফ দিয়েছে জাফরান। যুদ্ধের আগে মানভেদে বিক্রি হতো ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে দেড় লাখ। বর্তমানে কেজিতে এক লাফে ৩ লাখ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪ লাখ ২০ হাজার থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া বর্তমানে মানভেদে প্রতি কেজি এলাচ ৪ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি ভারতীয় জিরা ৫৭৫ টাকা, চায়না দারুচিনি ৩৬৫ টাকা এবং ইন্দোনেশিয়ান লবঙ্গ ১ হাজার ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মরিচ ২২০ টাকা, ভারতীয় মরিচ ৩৬০ টাকা এবং হলুদ ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের দাবি, মসলার দাম বৃদ্ধির জন্য বাস্তব কারণের চেয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরির প্রবণতাই দায়ী। খাতুনগঞ্জের মসলার বাজার মূলত হাতে গোনা কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে। এ সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ‘ডিও’ (ডেলিভারি অর্ডার) বা স্লিপ বাণিজ্য। বাজারে পণ্য আসার আগেই এ কাগজের স্লিপ কয়েক দফা হাতবদল হয় এবং প্রতিটি হাতবদলে পণ্যের দাম কেজিতে বাড়তে থাকে। রসিদবিহীন এ লেনদেনের কারণে বাজার পুরোপুরি জুয়ার আসরে পরিণত হয়েছে। কয়েকজন মসলা আমদানিকারক জানান, মসলার দাম বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক কারণগুলোর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ কিছু কারণ দায়ী। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকিং জটিলতার কারণে আমদানিকারকদের খরচ বেড়ে যাওয়া। বেড়েছে পরিবহন ব্যয়ও। তাই মসলার দাম বেড়েছে।

সরকারি হিসাব মতে, দেশে বছরে মসলাজাতীয় পণ্যের চাহিদা রয়েছে ৩৫ লাখ টনের বেশি। যার ৪০ থেকে ৪২ শতাংশ সরাসরি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।

এ বিভাগের অন্যান্য