ট্রেনে সুরক্ষা তলানিতে, বাড়ছে আগুনের শঙ্কা

সিলেটের সময় ডেস্ক :

 

প্রতিদিন ৩ লাখের বেশি যাত্রী পরিবহণ করছে রেলওয়ে। ২৭৫ থেকে ২৮০টি ট্রেনের মধ্যে গুটিকয়েকটিতে নামমাত্র অগ্নিনির্বাপণ (ফায়ার এক্সটিংগুইশার) ব্যবস্থা রয়েছে। আগুন নির্ণয় ও নির্বাপণব্যবস্থা ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখারও যেন কেউ নেই! ভুক্তভোগী এবং সাধারণ যাত্রীদের বক্তব্য-কিছু দিন পরপরই ট্রেনে বড় ধরনের আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। চোখের সামনেই একেকটি বগি-ইঞ্জিন পুড়ে যায়। কারও কিছু করার থাকে না। রেলের কোথাও নিজস্ব ফায়ার সার্ভিস, ফায়ারম্যান অগ্নিনির্বাপণের আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। ২৬ মার্চ চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৩টি বগি পুড়ে গেছে। প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও যাত্রীদের অনেকেই কমবেশি আহত হয়েছেন। বছরে এমন ১৫-২০টি বড় ধরনের আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে। প্রায় ১৭ বছরে ২৮৫টির বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ট্রেনের আগুন বহু নিরপরাধ যাত্রীকে অঙ্গার করে দিয়েছে। ভস্মীভূত হয়েছে বহু কোচ-ইঞ্জিনও। তবু অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থার জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ট্রেনে প্রকাশ্যে ধূমপান করা হলেও-নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিশ্বের উন্নত সব দেশের রেলওয়েতে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা রয়েছে। ওই দেশগুলোতে প্রশিক্ষিত লোকবলসহ আলাদা ইউনিট থাকলেও-বাংলাদেশ রেলওয়েতে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই। এ প্রসঙ্গে রোববার সন্ধ্যায় রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রেলে কোনো ফায়ার স্টেশন, লোকবল কিংবা যানবাহন নেই। তবে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ (ফায়ার এক্সটিংগুইশার) ব্যবস্থা থাকলেও তা কার্যকর নেই। চলন্ত অবস্থায় আগুন লাগলে তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। স্থানীয় ফায়ার স্টেশনের সহায়তাই আমাদের ভরসা। বর্তমান সরকার ট্রেনসহ পুরো রেলে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে পরিকল্পনা নিচ্ছে। রেলে নিজস্ব ফায়ার প্রতিরোধব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় লোকবল ও যন্ত্রাংশের খুবই প্রয়োজন।

রেলওয়ে পরিবহণ ও অবকাঠামো দপ্তর সূত্রে জানা যায়, রেলে বর্তমানে ২৮০টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে। রেলওয়ের কাগজপত্রে উল্লিখিত-১১৪টি আন্তঃনগর ট্রেনে অগ্নিনির্বাপণ (ফায়ার এক্সটিংগুইশার) ব্যবস্থা নিশ্চিত থাকার কথা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ট্রেন এক্সামিনার, ট্রেন কন্ট্রোলার জানান, বিরতিহীন এক্সপ্রেস তিনটিসহ ৮-১০টি ট্রেনের বিভিন্ন কামরায় ফায়ার এক্সটিংগুইশার রয়েছে। তবে এগুলো চালানোর নির্ধারিত কোনো লোকবল নেই। সচল রয়েছে কিনা, তাও দেখার কেউ নেই। ফলে ট্রেনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটলে, সাধারণ যাত্রীসহ ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত স্টাফরা নিজেদের জানমাল বাঁচাতে ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়েন। এতে অনেকেই গুরুতর আহতও হন। অনেকেই পুড়ে অঙ্গার হন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লোকাল-মেইল, কমিউটার ট্রেনে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা একেবারেই শূন্য। রেলওয়ের তথ্য বলছে, পুরো রেলের কোথাও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি নেই। লোকবল তো নেইই-রেলের কাউকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়নি। ফলে আগুন লাগলে রেলের কিছুই করার থাকে না।

রেলওয়ে প্রকৌশল ও যান্ত্রিক দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ট্রেনের কামরায় অগ্নিকাণ্ড ঠেকাতে ‘ফায়ার ডিটেকশন অ্যালার্ম’, ‘ফায়ার ডিটেকশন অ্যান্ড ব্রেক অ্যাপ্লিকেশন সিস্টেম’ ব্যবহারের প্রয়োজনীয় নিয়ে বহুবার আলোচনা করলেও, তা বাস্তবায়ন হয়নি। এটি বাস্তবায়ন হলে ট্রেনে ধোঁয়া বা আগুনের আভাস পাওয়া মাত্রই আপনা থেকেই ট্রেন থেমে যাবে। কিন্তু, বাংলাদেশ রেলওয়েতে ট্রেনে আগুন লাগার পরও ট্রেন চলতে থাকে, বাতাসের গতিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় ট্রেনের চালক ও গার্ড দীর্ঘ সময় পযর্ন্ত আগুন লাগার ঘটনাও জানতে পারেন না। ফলে, আগুন নিয়ে রেলের আশঙ্কা দিন দিন বাড়ছেই।

সূত্র জানায়, রেলে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা যথাযথ না থাকায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের অদূরে গোপীবাগ এলাকায় বেনাপোল আন্তঃনগর ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫টি বগি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে ৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর রাজধানীর তেজগাঁও রেলওয়ে স্টেশনে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের ঘণ্টায় ৫ জনের মৃত্যু হয়। বেশ কয়েকটি কোচ পুড়ে যায়। ২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন লেগে ৪টি কোচ ও ইঞ্জিন পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, শুধু ২০২৪ সালে দেশে ১৯টি ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের কারণ হিসাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, ইঞ্জিন বা জেনারেটরের অতিরিক্ত তাপ এবং নাশকতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য