তাহিরপুরের হাওরাঞ্চলে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি: পানিতে ডোবে শুধু কৃষকের স্বপ্ন
বশির আহমদ জুয়েল,
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার মানুষ বোরো ধানের ওপরই নির্ভরশীল। শনির হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, মাটিয়ান, পালই, বনুয়া, বাতজুর, কালমা—এসব হাওর শুধু পানি নয়, হাজারো কৃষকের জীবনধারণের একমাত্র ভরসা। কিন্তু প্রতিবছর একই অভিযোগ—বাঁধ সময়মতো হয় না, নিম্নমানের কাজ, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, আর বরাদ্দের টাকা ভাগ-বাটোয়ারা। যার ফলে সামান্য বন্যা বা আগাম স্রোত এলেই হাওরের বাঁধ ভেঙে যায়, ডুবে যায় কৃষকের রক্তঘাম।
বরাদ্দ আসে কোটি কোটি, কিন্তু মাটির বাঁধ থাকে হাতের এক চাপেই ভেঙে যাওয়ার মতো। সরকার প্রতিবছর হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণে বিপুল বরাদ্দ দেয়। তাহিরপুর উপজেলায় শনির হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, মাটিয়ান ও পালই হাওরসহ প্রতিটি হাওরে বরাদ্দের অঙ্ক অনেক মোটা হয়ে থাকে। কিন্তু কৃষকের প্রশ্ন—
“এই কোটি কোটি টাকা যায় কোথায়?” হাওরে গেলে দেখা যায়—নামমাত্র কয়েক ফুট মাটি দিয়ে গড়ে তোলা নামমাত্র বাঁধ। কোথাও কোথাও নরম কাদা ব্যবহার করে বানানো হয় অস্থায়ী ব্যারিকেড। কখনো কখনো কাজ শুরুর পরই কয়েকদিন বিরতি দেয়া হয়। শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়। হাওরের একজন কৃষকের ভাষায়—
“বাঁধ দেখতে গেলে মনে হয়, বাতাস দিলেই উড়ে যাবে। পানি তো দূরের কথা।”
সময় মতো তদারকি করার কেউ থাকে না। কাগজের পাতায় আছে তাহিরপুরের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কয়েকটি হাওর-বিষয়ক সংগঠন, কিছু পরিবেশবাদী গ্রুপ—সব মিলিয়ে গড়ে ওঠে যেনো কাল্পনিক বার্ষিক “তদারকি কমিটি”।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়—কাজ চলাকালেই তারা অনুপস্থিত। ঠিকাদারের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। বরাদ্দ আসামাত্র ফোনে–বৈঠকে ‘সমঝোতা। তবে হাওরের বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকলেই সামাজিক মাধ্যমে তাদের কেউ কেউ প্রতিবাদ-সমাবেশ নিয়ে হাজির হয়। যা সচেতন মহনের কাছে বরাবরই হাস্যকর।
এ ব্যাপারে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে যে—প্রতিবাদ যখন পানির পরে হয়, তখন সেই প্রতিবাদের লাভটাই বা কে খায়? কৃষক তো ফসল হারিয়েই ফেলেছে!
উল্লেখ করা আবশ্যক যে, পরিবেশ–জীববৈচিত্র্যের অভয়ারণ্য টাঙ্গুয়ার হাওর শুধু পর্যটনের কেন্দ্র নয়—এটি তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার হাজারো কৃষকের বোরো ধানের ব্যাংক। কিন্তু টাঙ্গুয়ার হাওরের বোরো কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ:
টাঙ্গুয়ার পাড় সংলগ্ন জায়গাগুলোতে বাঁধের কাজ সবসময়ই ধীরগতি, বর্ষার আগেই পানি জমে, আর ছোটখাটো ঢলেই বাঁধ ভেঙে যায়। কৃষকেরা জানতে চায়— এত গুরুত্বপূর্ণ হাওরের বাঁধ কেন বারবার ভাঙে? এটা কি পরিকল্পিত?
শনির হাওর—তাহিরপুরের ‘সোনার খনি’, কেউ কেউ বলে দুর্নীতিবাজদেরও ‘সোনার খনি’। শনির হাওর প্রতি বছরই বেশি উৎপাদন দেয়। তাই বরাদ্দও বেশি। অভিযোগও বেশি। এখানে দেখা যায়— স্থানীয় কিছু নামধারী সংগঠনের “বাঁধ কমিটি” নিয়ে টানাটানি
কোন ঠিকাদার পাবে—এ নিয়ে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনবাজির মতো প্রতিযোগিতা কাজ শুরুর আগেই অংশীদারিত্বের গোপন ভাগাভাগি। ফলে কৃষকের মাথায় ক্ষতির বোঝা। এ যেন একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মডেল—সবাই পায়, কৃষক ছাড়া!
মাটিয়ান, পালই ও বনুয়া—ফসলের মাঠ নয়, যেনো দুর্নীতির পরীক্ষাগার। মাটিয়ান হাওর প্রায়ই দেখা যায় বাঁধের এক পাশ উঁচু, আরেক পাশ নিচু—অর্থাৎ কাজ সমানভাবে হয়নি। কাজ হয় “ডিপি–চালান” অনুযায়ী, মাঠ অনুযায়ী নয়।
পালই হাওর, এখানে অভিযোগ—চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের মজুরি ঠিকাদারের দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক সময় স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে শ্রমিক নেয়া হয়, আর লেনদেনে কাটছাঁট হয়।
বনুয়া হাওর, অল্প বাজেটে কাজ দেখানো, কিন্তু কাগজে বড় অঙ্ক দেখানো—এটিকে কৃষকেরা বলে “বনুয়া মডেল”—যেখানে কাজের চেয়ে হিসাব বড়!
ঠিকাদার–সংগঠন–কর্মকর্তা: অদৃশ্য ত্রিমুখী জোট
তাহিরপুরে অভিযোগটি এখন আর গুজব নয়—
ঠিকাদারি গ্রুপ + কিছু স্থানীয় সংগঠন + মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা = হাওর রক্ষার নামে লুটপাটের ত্রিভুজ সিন্ডিকেকে বন্দি হাওরপাড়ের মানুষ।
মূলত এই কারণে—নিম্নমানের কাজ জমি ডুবায়। বাঁধ ভাঙলে ঠিকাদারের কোন ক্ষতি নেই। বরাদ্দ দিয়ে কোন প্রকৃতির উন্নতি হয় না। বরং পরের বছর আবার বাড়তি বরাদ্দ আসে!
অর্থাৎ—ফসল নষ্ট হলে ক্ষতি কৃষকের, কিন্তু লাভ ঠিকাদার ও সিন্ডিকেটের। কৃষকের কান্না—কারও চোখে জল আনে না। বরং কৃষকের কান্নার ছবি কারো কারো টাইমলাইনে হাইলাইটস হয়!
হাওরে যখন ধান ডুবে যায়: কৃষকের সারা বছরের সঞ্চয় শেষ। এনজিও–ব্যাংকের ঋণের চাপ বাড়া। সংসারের খরচ বন্ধ হতে থাকে। সন্তানদের পড়াশোনায় দেখা দেয় অনিশ্চিয়তা। কেউ কেউ পরিবারসহ ঢাকায় বা সীমান্তে শ্রমিকের কাজ খুঁজতে বাধ্য হয়।
অন্যদিকে—সিন্ডিকেটের কারও কোন ক্ষতি হয় না। বরং তারা পরের বছরের বরাদ্দের অপেক্ষায় থাকে।
তাহিরপুরসহ অন্যান্য হাওর বাঁচাতে হলে যা করা যেতে পারে বলে আমি মনে করি:
১. কৃষক–কেন্দ্রিক পরিকল্পনা ও বাঁধ কমিটি। যাদের ফসল ডোবে, তাদেরই সিদ্ধান্তে থাকতে হবে।রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কমাতে হবে।
২. বরাদ্দ ও কাজের অগ্রগতি অনলাইন ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ। কোন হাওরে কত টাকা, কোন ঠিকাদার, কত শতাংশ কাজ হয়েছে—সব জনসমক্ষে থাকা বাধ্যতামূলক।
৩. বাঁধ ভাঙলে ঠিকাদারের আর্থিক দায় ফসলের ক্ষতির কমপক্ষে ৫০% ক্ষতিপূরণ ঠিকাদারের থেকে আদায় করতে হবে।
৪. মাঠে বাস্তব তদারকি—সামাজিক সংগঠনের আয়-ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ। সংগঠন নামধারী দালালি বন্ধ করতে হবে।
৫. স্বচ্ছ, বিজ্ঞানভিত্তিক বাঁধ নির্মাণ নকশা ঢল–পানি–বাতাসের প্রকৃতি অনুযায়ী বাঁধের উচ্চতা ও গুণমান নিশ্চিত করা।
পরিশেষে বলা যেতে পারে, তাহিরপুরের শনির হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর, মাটিয়ান, পালই, বনুয়া—এসব হাওর শুধু পানি নয়, জীবিকা। কিন্তু দুর্নীতি–গাফিলতির সিন্ডিকেট আজ এই হাওরগুলোকে বিপদজনক পরীক্ষা–ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। ফলে কৃষকের প্রশ্নও এখন সরাসরি—“আমাদের ফসল কি প্রাকৃতিক দুর্যোগে নষ্ট হয়, নাকি মানুষের বানানো দুর্নীতির বন্যায়?”
