খেই হারিয়ে ফেলেছেন ট্রাম্প, সামনে কঠিন চার পথ: দ্য ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ঃ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। বর্তমানে চতুর্থ সপ্তাহ চলছে এই যুদ্ধের। এরই মধ্যে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৌশল যেন ফ্লোরিডার আবহাওয়ার মতোই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। গত শুক্রবার যেখানে তিনি যুদ্ধ ‘গুটিয়ে আনার’ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ঠিক তার পরের দিনই ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি আগেভাগে আঁচ করতে না পারায় মার্কিন রণকৌশল এখন খেই হারিয়ে ফেলেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামনে খোলা রয়েছে চারটি পথ—আলোচনা, প্রস্থান, স্থিতাবস্থা বজায় রাখা অথবা যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়ানো। তবে সমস্যা হলো- এর প্রতিটি পথই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
১. আলোচনার টেবিল: ক্ষীণ আশা
কূটনীতিকদের একটি অংশ এখনও যুদ্ধবিরতির আশা করছেন, তবে বাস্তবতা ভিন্ন। আলোচনায় বসার আগেই ইরান দুবার আক্রান্ত হওয়ায় তারা এখন প্রচণ্ড সন্দিহান। তার ওপর, গত ৯ মার্চ ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতাবা খামেনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি, যা দেশটির নেতৃত্বের বিশৃঙ্খলাকেই ইঙ্গিত করে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওমান বা কাতারকে নিয়ে আরব দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে মতভেদ। এছাড়া পরমাণু কর্মসূচি বা ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষই এত কঠোর অবস্থানে যে, কোনও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা কারও মধ্যেই নেই।
২. ‘বিজয় ঘোষণা’ করে প্রস্থান
ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে সহজ পথ হতে পারে ইরানের নৌবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র কারখানা ধ্বংস হয়েছে দাবি করে যুদ্ধ শেষ করে দেওয়া। এতে আসন্ন নির্বাচনের আগে তেলের চড়া দাম কমার সুযোগ পাবে। কিন্তু এর নেতিবাচক দিক হলো, ইরান তার ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে যেকোনও সময় পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে পারে। এছাড়া হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে থেকে গেলে সেটি হবে গত ৫০ বছরের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির চরম পরাজয়।
৩. বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কট্টরপন্থিরা চান আরও কয়েক সপ্তাহ বিমান হামলা চালিয়ে ইরানকে পঙ্গু করে দিতে। তাদের দাবি, এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কমে আসবে এবং হয়তো বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে। কিন্তু এতেও কোনও নিশ্চয়তা নেই। ইরান যদি বিক্ষিপ্তভাবেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে, তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে। এছাড়া ক্রমাগত আক্রমণে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক শক্তি নিঃশেষ হয়ে পড়ছে।
৪. যুদ্ধের ভয়াবহ বিস্তার
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের মতে, এটি হবে ‘শান্তির জন্য যুদ্ধ বাড়ানো’। ট্রাম্প যদি হুমকি অনুযায়ী ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করেন বা দেশটির তেল সমৃদ্ধ খার্গ দ্বীপ দখল করতে মেরিন সেনা পাঠান, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এর পাল্টা জবাবে ইরান যদি উপসাগরীয় দেশগুলোর পানি শোধনাগার বা প্রাকৃতিক গ্যাস কেন্দ্রে হামলা চালায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি এক মহাবিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এরই মধ্যে কাতারের একটি এলএনজি প্ল্যান্টে ইরানি হামলায় বৈশ্বিক সরবরাহের তিন শতাংশ আগামী পাঁচ বছরের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
অনিশ্চিত সমাপ্তি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করলেও এটি শেষ করার কোনও সহজ পথ তার সামনে খোলা নেই। বিজয় ঘোষণা করলেই যে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে, তার কোনও গ্যারান্টি নেই। অন্যদিকে যুদ্ধের বিস্তার ঘটালে নিজের মিত্রদেরই ভয়াবহ বিপদের মুখে ঠেলে দেবেন তিনি। ওয়াশিংটন এখন এমন এক গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছে যেখান থেকে বের হওয়ার প্রতিটি রাস্তাই অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
