সংবাদ, সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার মুক্তি আবশ্যক

আবদুর রশিদ রেনু

দীর্ঘদিনের তন্ত্র–মন্ত্র, অদৃশ্য নকশা ও রাজনৈতিক প্রকৌশলের মাধ্যমে চব্বিশের জুলাই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে একদল মানুষরূপী জানোয়ার রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। মাত্র আঠারো মাসে তারা বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার মূল্যবোধকে এমনভাবে পদদলিত করেছে—যেন দেশের মূল ভিত্তিকেই ছিন্নভিন্ন করে ফেলার এক সূক্ষ্ম ও সুপরিকল্পিত প্রয়াস চালানো হয়েছে।
এই অবৈধ শাসনামলে মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন ক্ষমতার বলয় দেশকে এক দমবন্ধ অন্ধকারে ঠেলে দেয়। বিচারহীন গ্রেপ্তার, রাতের বেলায় তুলে নেওয়া, ভুয়া অভিযোগে আটক এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার—সব মিলিয়ে নাগরিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে প্রান্তসীমায় দাঁড় করিয়ে দেয়।

এই অন্ধকার সময় সবচেয়ে গভীর আঘাত আসে গণমাধ্যমে। টেলিভিশন ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে ভাষাহীন আতঙ্ক—এক অব্যক্ত ভয়, এক নিঃশব্দ মৃত্যু। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা পক্ষের সাংবাদিকদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নজরদারি ও হয়রানির মাধ্যমে ভিন্নমতকে শিকলে বেঁধে ফেলা হয়। ক্ষমতাসীন অযোগ্য উপদেষ্টাদের উদ্ধত হুমকি ও কথিত প্রেস-সহযোগীদের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ গণমাধ্যমকে আরও কোণঠাসা করে তোলে।

এই সময়কালে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর আত্মসমর্পণ ছিল সবচেয়ে বেদনার। এমন নীরবতা দেখা গেছে, যেন পুরো সংবাদমাধ্যমই সমষ্টিগতভাবে মৃত। তবে নতুন নতুন কিছু সাংবাদিক মুখ জাতি দেখতে পেয়েছে। কিন্তু প্রতিবাদের আহ্বান উঠেনি, কণ্ঠস্বর ভেসে ওঠেনি—রাষ্ট্রীয় দমনের সামনে যেন সবাই পরাজিত।

এই অন্ধকারের মাঝে সবচেয়ে নির্মম ছিল স্বনামধন্য সাংবাদিক আনিস আলমগীর–কে বিনা অভিযোগে তুলে নিয়ে যাওয়া এবং তাঁর বিরুদ্ধে অবিশ্বাস্য, ভিত্তিহীন অভিযোগ দাঁড় করানো। দেশের বড় বড় সম্পাদক, মালিক কিংবা সংগঠনের নেতৃত্ব—কেউই তাঁর মুক্তির দাবিতে একটিবারও মুখ খুললেন না। কর্পোরেট ভিত্তিক সাংবাদিকতার ফলে যা হয় তাই হয়েছ। এ যেন রাষ্ট্রীয় দমনের সামনে জাতির আত্মসমর্পণের এক চিত্র।

তবুও, অন্ধকারের ভেতর আলো থাকে। প্রেসক্লাবের সামনে কিছু সাহসী সাংবাদিকের মানববন্ধনের ছবি আজ সেই আলোরই প্রমাণ। তারা দেখিয়ে দিয়েছেন—বাংলাদেশের গণমাধ্যম পুরোপুরি মৃত নয়। এখনও কিছু সাহসী মানুষ আছেন, যারা বন্দী সহকর্মীদের মুক্তির দাবি তুলতে ভয় পান না। এই মানুষগুলোই গণতন্ত্রের শেষ শ্বাসরুদ্ধ কণ্ঠকে আবার জাগিয়ে তুলছেন। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা—নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ অতীতের মতো ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না, বরং আইনের শাসন, গণমাধ্যমের নিরাপত্তা এবং স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত করবেন।

কারণ—যেখানে সাংবাদিক কণ্ঠরুদ্ধ, সেখানে রাষ্ট্র অন্ধ; যেখানে সংবাদমাধ্যম বন্দী, সেখানে গণতন্ত্র পঙ্গু।
তবে ফেইসবুক ভিত্তিক আর মোবাইল সাংবাদিকতা রোধের ব্যাপারে তথ্যমন্ত্রীকে সজাগ থাকতে হবে।
আমাদের দাবি সুস্পষ্ট: সংবাদের মুক্তি আবশ্যক , সাংবাদিকদের মুক্তি আবশ্যক ।
সাংবাদিকতার মুক্তি আবশ্যক । স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম শর্ত—স্বাধীন গণমাধ্যম।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সিলেট প্রেসক্লাব।

এ বিভাগের অন্যান্য