পরিবর্তনের প্রতীক্ষা থেকে অনিশ্চয়তার বাস্তবতা

বশির আহমদ জুয়েল

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক দিন হয়ে ওঠে। অমানবিক ও কালো অধ্যায় সৃষ্টির ইতিহাস বলা যেতে পারে। দীর্ঘ ১৬ বছরের ক্ষমতাধর আওয়ামী লীগ সরকারকে সরানোর পর মানুষ ভেবেছিল — এবার হয়তো তারা মুক্তি পাবে ভয়, দমননীতি আর দলীয় স্বার্থনির্ভর প্রশাসন থেকে।
সেই আশায়ই অনেকে নতুন শাসনব্যবস্থাকে স্বাগত জানিয়েছিল, অনেকেই রাস্তায় নেমে আনন্দ করেছিল।

কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই আনন্দে দেখা দেয় হতাশার ছায়া। নতুন সরকার ক্ষমতায় এলেও স্থিতিশীলতা আসে না; বরং রাজপথে অনিশ্চয়তা, প্রশাসনে দ্বিধা, আর সাধারণ মানুষের মনে ভয়— “এবার কী হবে?” — এই প্রশ্নই যেন নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়।

শাসন পরিবর্তনের পর বিভ্রান্ত জনমানস। প্রথম কয়েক মাসেই দেখা যায়—প্রশাসনিক কাঠামো অনেক ঢিলেঢালা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা অস্পষ্ট হয়, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, আর বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও বেকারত্বের হার আরও বেড়ে যায়। যার ফলে সেই জনগণই, যারা “পরিবর্তনের” স্বপ্নে উচ্ছ্বসিত ছিল, তারা এখন হতাশ হয়ে বলছে —আগে অন্তত শৃঙ্খলা ছিল, এখন না আছে ন্যায়, না আছে নিরাপত্তা। আজ বাংলাদেশের নানা স্তরে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত একটি বাক্য: “আগে ভালো ছিল।”

দেশের মানুষের মনে কেন এই আস্থাহীনতা তৈরি হলো? এর জবাবে অনেক কারণ বলা যাবে। তার মধ্যে যা উল্লেখ করা যেতে পারে—

এক. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে — এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল,বিনিয়োগ বন্ধ, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে স্থবিরতা, ব্যাংকিং খাতে অস্থিরতা, আর দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উত্থান।
ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছে।

দুই. রাজনৈতিক শূন্যতা ও দলীয় দ্বন্দ্ব: আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর একদিকে তারা আত্মসমালোচনায় ব্যস্ত, অন্যদিকে নতুন প্রশাসনের ভিতরে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা চলমান। কে নীতিনির্ধারক, কে দায়ভার নেবে — সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। ফলে সাধারণ মানুষের মনে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যারা এখন ক্ষমতায়, তারাও জানে না কী করতে হবে।

তিন. আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা: গ্রামাঞ্চলে ও ছোট শহরে চাঁদাবাজি, দখল ও প্রতিশোধমূলক হামলা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। যারা নতুন শাসনকে সমর্থন করেছিল, তারাও আজ ভুক্তভোগী।

চার. জনগণের প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা: মানুষ ভেবেছিল — বর্তমান নেতৃত্বাধীন সরকার দ্রুত গণতান্ত্রিক কাঠামো ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের নামে সময় পার হয়ে যাচ্ছে। ফলে জনআস্থা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। নির্বাচনের নামে ঝুলছে মুলা সবখানে।

দেশের মানুষের মুখে এখন, আগেই ভালো ছিল— এই বক্তব্যের মনস্তত্ত্ব হচ্ছে এই বাক্যটি শুধু অতীতপ্রেম নয়, বরং একধরনের হারিয়ে যাওয়া নিরাপত্তা ও নিশ্চিততার আকাঙ্ক্ষা। মানুষ শাসন ব্যবস্থায় নিখুঁততা চায় না, চায় নিরাপত্তা, স্থিতি আর নিয়ন্ত্রণ। যখন সেটি হারিয়ে যায়, তখন তারা আগের অন্যায়কেও সহনীয় মনে করে। এ ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানীরাও বলেছেন — “মানুষ বিশৃঙ্খলার চেয়ে নিয়ন্ত্রিত অন্যায়কে বেশি সহ্য করতে পারে।” আজকের বাংলাদেশ সেই বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতার বাইরে থাকলেও তাদের সাংগঠনিক শক্তি এখনও গ্রামীণ পর্যায়ে টিকে আছে। তাদের অনেক নেতাকর্মী এখন বলছেন, “জনগণই বুঝতে শুরু করেছে আমরা যা করেছিলাম, সেটা এত খারাপ ছিল না।”

অন্যদিকে বিএনপি ও নতুন রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো, যারা সরকারের পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছিল,
তারা এখন নিজের অবস্থান রক্ষা করতেই হিমশিম খাচ্ছে। যাদের ওপর জনগণ আস্থা রেখেছিল, তারাই আজ সন্দেহের মুখে। বাংলাদেশ এখন এক সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে পুরনো রাজনৈতিক কাঠামো পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি — এই দুই স্রোতের মধ্যে টানাপোড়েনে আছে গোটা জাতি। যদি বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়,
তবে “আগেই ভালো ছিল” শুধু আক্ষেপ নয়,
বরং একটি রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিতও হয়ে উঠতে পারে।

এ বিভাগের অন্যান্য