আল্লাহর প্রতি যে ধারণা মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি
সিলেটের সময় ডেস্ক :
মানুষের জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে, যখন দীর্ঘদিনের দোয়া কবুল হতে দেরি হয়, আশা পূরণ হয় না কিংবা প্রতীক্ষার সময়টা দীর্ঘ হয়ে যায়। তখন অনেকের হৃদয়ে হতাশা, অস্থিরতা কিংবা প্রশ্নের জন্ম নেয়। কিন্তু একজন সত্যিকারের মুমিন জানেন— আল্লাহর সিদ্ধান্তে কখনো ভুল নেই, তার পরিকল্পনায় কোনো ত্রুটি নেই এবং তার রহমত কখনো তার বান্দাকে ছেড়ে যায় না।
মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো— সে সুখে-দুঃখে, প্রাপ্তিতে-অপ্রাপ্তিতে এবং সহজে-কঠিনে সর্বদা আল্লাহ সম্পর্কে উত্তম ধারণা পোষণ করে। কারণ সে বিশ্বাস করে, আল্লাহ যা করেন তা বান্দার কল্যাণের জন্যই করেন, যদিও সেই কল্যাণের রহস্য অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করা যায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَعَسَىٰ أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
‘হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আবার হতে পারে তোমরা কোনো বিষয় পছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২১৬)
আল্লাহ কখনো তার বান্দার প্রতি অবিচার করেন না
এই পৃথিবীতে অনেক সময় মানুষের মনে হতে পারে যে তার কষ্ট কেউ দেখছে না, তার চোখের জল বৃথা ঝরছে কিংবা তার চেষ্টা মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একজন মুমিনের বিশ্বাস হলো— আল্লাহর কাছে কিছুই হারিয়ে যায় না। তিনি প্রতিটি অশ্রুবিন্দু দেখেন, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস শোনেন এবং প্রতিটি নেক প্রচেষ্টার হিসাব সংরক্ষণ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অণু পরিমাণও কারও প্রতি জুলুম করেন না।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৪০)
অতএব জীবনের কোনো পরীক্ষাই অবিচার নয়; বরং তা হতে পারে আল্লাহর পক্ষ থেকে মর্যাদা বৃদ্ধি, গুনাহ মাফ কিংবা বৃহত্তর কল্যাণের প্রস্তুতি।
দোয়া বিলম্বিত হওয়া মানেই প্রত্যাখ্যাত হওয়া নয়
অনেক সময় আমরা দ্রুত ফলাফল চাই। কিন্তু আল্লাহর কাছে সময়ের হিসাব আমাদের হিসাবের মতো নয়। তিনি জানেন কোন জিনিসটি কখন আমাদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
يُسْتَجَابُ لِأَحَدِكُمْ مَا لَمْ يَعْجَلْ، يَقُولُ: دَعَوْتُ فَلَمْ يُسْتَجَبْ لِي
‘তোমাদের প্রত্যেকের দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে বলে— আমি দোয়া করেছি কিন্তু তা কবুল হয়নি।’ (বুখারি ৬৩৪০, মুসলিম ২৭৩৫)
সুতরাং দোয়া দেরিতে কবুল হওয়া হতাশার কারণ নয়; বরং এটি ধৈর্য, ঈমান ও আল্লাহর প্রতি আস্থার পরীক্ষা।
আল্লাহ যখন আটকে রাখেন, তাতেও থাকে রহমত
অনেক সময় আমরা এমন কিছু চাই যা আমাদের কাছে ভালো মনে হয়, কিন্তু আল্লাহ তার অসীম জ্ঞানে জানেন সেটি আমাদের জন্য উপকারী নয়। তাই তিনি তা থেকে দূরে রাখেন। কখনো তিনি কোনো চাওয়া বিলম্বিত করেন, কখনো আরও উত্তম কিছু দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করান, আবার কখনো সেই দোয়ার বিনিময়ে আখিরাতের জন্য মহাপুরস্কার সংরক্ষণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَدْعُو اللَّهَ بِدَعْوَةٍ لَيْسَ فِيهَا إِثْمٌ وَلَا قَطِيعَةُ رَحِمٍ إِلَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ بِهَا إِحْدَى ثَلَاثٍ
‘কোনো মুসলিম যখন এমন কোনো দোয়া করে যাতে গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় নেই, তখন আল্লাহ তাকে তিনটির একটি দান করেন—হয় তার দোয়া দ্রুত কবুল করেন, অথবা তা আখিরাতের জন্য সঞ্চয় করেন, কিংবা সমপরিমাণ কোনো বিপদ তার থেকে দূর করে দেন।’ (মুসনাদ আহমাদ ১১১৩৩)
উত্তম ধারণা: মুমিনের অন্তরের আলো
আল্লাহ সম্পর্কে সুন্দর ধারণা রাখা শুধু একটি নৈতিক গুণ নয়; এটি ইবাদতেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي
‘আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যেমন ধারণা রাখে, আমি তার সঙ্গে তেমন আচরণ করি।’ (বুখারি ৭৪০৫, মুসলিম ২৬৭৫)
তাই কঠিন সময়েও একজন মুমিনের হৃদয়ে এই বিশ্বাস জাগ্রত থাকে যে, আল্লাহ তাকে ভুলে যাননি, বরং তার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থাই নির্ধারণ করে রেখেছেন।
জীবনের প্রতিটি বিলম্ব, প্রতিটি অপ্রাপ্তি এবং প্রতিটি পরীক্ষার পেছনে আল্লাহর অসীম হিকমত ও রহমত লুকিয়ে থাকে। তাই কোনো দোয়া কবুল হতে দেরি হলে হতাশ হওয়ার কারণ নেই; বরং আরও বেশি আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া উচিত।
মনে রাখতে হবে, আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দার কান্না উপেক্ষা করেন না, কোনো সৎ প্রচেষ্টা নষ্ট হতে দেন না এবং কাউকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেন না। তিনি যখন কিছু দেন, তা তার অগণিত রহমতের মাধ্যমে দেন; আর যখন কিছু বিলম্বিত করেন, তখনও তা বান্দার কল্যাণের জন্যই করেন।
অতএব, প্রতিকূলতার অন্ধকারে নয়, আল্লাহর প্রতি সুন্দর ধারণার আলোতেই একজন মুমিন তার পথ খুঁজে নেয়। কারণ যে হৃদয় আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শিখে, সে কখনো প্রকৃত অর্থে হারিয়ে যায় না।
