এখনো সালমান মানে আমি : মৌসুমী
বিনোদন ডেস্ক ঃ
১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ ঈদুল ফিতরে বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় চলচ্চিত্র ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। দীর্ঘ ৩৩ বছর পর আবার এই মার্চেই উদযাপিত হবে ঈদুল ফিতর। তাই স্মৃতির মণিকোঠায় ভেসে উঠছে এই জনপ্রিয় চলচ্চিত্রটির কথা। প্রয়াত নির্মাতা সোহানুর রহমান সোহানের এ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে দেশের চলচ্চিত্রপ্রেমী মানুষেরা পেয়েছিলেন দুটি নতুন মুখ-মৌসুমী ও সালমান শাহ। প্রথম ছবিতেই তাঁরা বাজিমাত করেন, অভিনয় দিয়ে মানুষের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নেন। ৩০ বছর আগে সালমান শাহ মারা যান। এক ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে সালমান শাহ মানুষের মনে বেঁচে আছেন, থাকবেন চিরকাল। সালমান আজ বেঁচে নেই। আছেন মৌসুমী। এই চলচ্চিত্রের নানা দিক উঠে এসেছে তার স্মৃতিচারণে।
যেভাবে যুক্ত হন মৌসুমী
মৌসুমী বলেন, ‘আমার ছবির প্রস্তাবগুলো আসত গুলজার (পরিচালক মুশফিকুর রহমান) ভাইয়ের মাধ্যমে, তখন তিনি ছিলেন সাংবাদিক। আমার সাক্ষাৎকারের পরিকল্পনা করেন। সোহান ভাই বন্ধু হয়ে ঢাকায় আমাদের মোহাম্মদপুরে হুমায়ূন রোডের বাসায় এসেছিলেন। সেখানেই চলচ্চিত্রে আগ্রহী কি না, কৌশলে জানতে চান। তখন আমি স্থিরচিত্র আর বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হয়েই খুশি ছিলাম। মধ্যবিত্ত পরিবার, তাই নাটকে অভিনয়ের চেষ্টা করিনি। গুলজার ভাই বললেন, ‘ধরুন, হিন্দি ছবি ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ যদি বাংলায় রিমেক হয়, আপনি জুহি চাওলার চরিত্রটা করবেন, আমির খানের চরিত্রে নোবেল, তৌকীর আহমেদ কিংবা জাহিদ হাসানও হতে পারেন।’ তাঁরা জানতেন, তৌকীর ভাই আর নোবেল ভাইয়ের ভক্ত আমি। তখন কিছুটা আগ্রহী হলাম। কারণ, সহশিল্পী হিসেবে পছন্দের শিল্পীরা থাকবেন। আমি তখন থেকে স্বপ্ন দেখা শুরু করি। কীভাবে বাসায় বলা যায়, উপায় খুঁজছি। এরপর আরও অনেক ছবির প্রস্তাব পেয়ে আমি দ্বিধায় পড়ে যাই। মনে মনে বাছাই করতে থাকি, কার ছবি করব? ঘুরেফিরে দেখি, ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’।’
সালমানের স্মৃতিচারণে মৌসুমী
‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিতে প্রথম দিনের সংলাপ প্রসঙ্গে মৌসুমী বলেন, ‘প্রথম দিন ক্যামেরার সামনে ভয়ে কাঁপছিলাম। একটি দৃশ্য ছিল, ওই দিন একটা বাইকে সালমান আর আমি এফডিসি থেকে কাঁচপুর গেছি। আবার ফিরে আসি। ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিতে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ছিল ওটা।’ সালমান শাহর সঙ্গে আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল মৌসুমীর। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তখন খুলনায় থাকতাম। ছোটবেলায় ইমন (সালমান শাহর ডাকনাম) আর আমি প্লে গ্রুপ ও নার্সারিতে একসঙ্গে পড়েছি। বাবার চাকরির কারণে ইমনের পরিবার খুলনা সার্কিট হাউসে থাকত। ওই স্কুলে আমার ফুফু ছিলেন টিচার। ফুফুর ছুটি হওয়া পর্যন্ত ইমনদের বাসায় আড্ডা দিতাম। সেও আমাদের বাসায় যাওয়া-আসা করত। ভালো বন্ধুত্ব হয়। এরপর হঠাৎ ওরা ঢাকায় চলে আসে। বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুর দেখা হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা থাকে, তা ছবিটি করতে গিয়ে নতুন করে টের পাই। ছবির কাজ করার সময় আমাদের দেখা হয়। আবেগাপ্লুত হলাম। অল্প কয়েক দিনেই আমাদের সম্পর্ক আবার আগের রূপ নেয়। নিজেদের সবকিছুই একজন আরেকজনের সঙ্গে শেয়ার করতাম’।
এ যেন অন্যরকম স্বপ্ন
ছবিটির সাফল্যেও স্বপ্ন দেখা নিয়ে মৌসুমী বলেন,‘এটা যে প্রেমের আদর্শ গল্প হয়ে যাবে, আমার সঙ্গে সালমানের জুটি যে প্রেমের আদর্শ জুটি হবে, সবার প্রিয় জুটি হয়ে উঠবে, তা কখনো ভাবিনি। এত বড় স্বপ্ন মানুষ দেখতে পারে না। যখন পেছনে ফিরে তাকাই, দেখা যায়, এই স্বপ্ন যদি দেখতাম, তাহলে স্বপ্ন দেখেই মারা যেতাম। ৩৩ বছর সমানতালে জনপ্রিয় থাকবে একটি ছবি, আমাকে ‘কেয়ামত-কন্যা’ ডাকবে। এখনো সালমান মানে আমি, আমি মানে সালমান যে ভাববে, অথবা ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির প্রতিটি গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে স্পর্শ করবে, এসব ভাবার মতো শক্তি আল্লাহ দেননি। এটা আল্লাহর দান। এটা মানুষ কখনো সৃষ্টি করতে পারে না’, বললেন মৌসুমী।
সালমান-মৌসুমী রোমান্সের গভীরতা
প্রথম সবকিছুর মধ্যে একটা সজীবতা থাকে। জুটি নিয়ে অনেক কথা হয়, বিতর্ক হয়। কিন্তু সালমান শাহর মতো চিরসবুজ অভিনেতা, মৌসুমীর মতো চিরসবুজ অভিনেত্রী তাদের প্রথম যাত্রা যখন শুরু করল সেটার আয়োজন এবং ছবি মুক্তির পরে গ্রহণযোগ্যতা যেভাবে গড়িয়েছে, আজও যেভাবে এ সিনেমার জন্য ভক্ত-দর্শকের অসীম আগ্রহ দেশের অলিতে-গলিতে তাকে ইতিহাস ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। এমন ইতিহাস দেশের সিনেমার ইতিহাসে নেই। অন্য অনেক জুটি আছে কিন্তু সালমান শাহর শুরুটা মৌসুমীর সঙ্গেই তাই শুরুর যে মাহাত্ম্য সেটা আর কোনোকিছুর সঙ্গে মেলে না। কথা হচ্ছে একটা ইতিহাস যেখানে নতুন করে শুরু হলো অন্যকিছু সেখানে ততটা গভীরতা পায় না। সালমান ও মৌসুমীর সঙ্গে প্রথমেই ইতিহাস গড়েছে জুটির জন্য, ছবির জন্য, অভিনয়ের জন্য। দুজনের রোমান্স, হাসি, কান্না, উৎসর্গ এসব প্রথম জুটির ইতিহাসের দিক থেকে যেভাবে দর্শককে টেনছে সেটার তুলনা আর কারও সঙ্গে করা যায় না। যদি কারও প্রথম সন্তান হবার আগের মুহূর্তটাকে বলতে বলা হয় সেটা তো নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ অনুভূতি হবে। কারণ তারা জানে প্রথমবার মা-বাবা হওয়ার অনুভূতি কতটা গভীর। সালমান-মৌসুমী জুটি তো সেটাই দিয়েছে দর্শককে, যেখানে প্রথম প্রেম, প্রথম সন্তানের মতো চিরন্তন গভীর অনুভূতি আছে।
