তীব্রতর হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত : তেলের দাম বেড়েছে, কমেছে শেয়ারের দাম
ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মঙ্গলবার বাহিনী ইরানের বিভিন্ন স্থানে একযোগে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা হামলা চালায়। সংঘাত লেবাননেও ছড়িয়ে পড়ে, এতে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। যুদ্ধের চতুর্থ দিনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বহু নৌ ও বিমানঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে।
তেহরান থেকে টেলিফোনে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ৩২ বছর বয়সী ব্যাংক কর্মী বিজান বলেন, ‘এভাবে আর কতদিন চলবে? আশ্রয়কেন্দ্র কোথায়? সরকার কোথায়? প্রতি রাতে আমি আর আমার স্ত্রী বেসমেন্টে লুকিয়ে থাকি। পুরো শহর ফাঁকা। চারদিকে ধোঁয়া আর রক্ত।’ ফিরুজেহ সেরাজ বলেন, রাজধানীর একটি হাসপাতালে হামলা হওয়ার পর তিনি তার ১০ বছর বয়সী মেয়েকে ডায়ালাইসিস করাতে নিতে ভয় পাচ্ছেন। তেহরান থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব, তোমরা কি দেখছ? তারা আমাদের হত্যা করছে। আমাদের আওয়াজ শুনো।’
শেয়ারবাজারে পতন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় শেয়ার বাজারে বড় ধরনের পতন হয়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ৫ শতাংশ বেড়ে গেছে এবং ইউরোপীয় বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের পাইকারি দাম ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা পেট্রোলের দাম গড়ে প্রতি গ্যালন ৩.১১ ডলারে পৌঁছেছে। মধ্যাহ্ন পর্যন্ত ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার বাজার কমেছে। ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারও ৩ শতাংশের বেশি পড়েছে।
বুধবার এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলের শেয়ার বাজারে তৃতীয় দিনের মতো পতন দেখা গেছে। একই সময়ে তেলের দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের পরিস্থিতি লক্ষ্য করছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক ১০ শতাংশের বেশি পড়েছে। এতে ব্যবসা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল ‘সার্কিট ব্রেকার’ ব্যবস্থার মাধ্যমে।
জাপানের নিকেই ২২৫ সূচক ৩.৯ শতাংশ কমেছে আর অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ সূচক ১.৮ শতাংশ পড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেল এশিয়ার সকালের বাজারে প্রায় ০.৭ শতাংশ বেড়েছে, যা গত দুই দিনে দ্রুত দাম বাড়ার পর এসেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ব অর্থবাজারকে অস্থির করে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী নিকটবর্তী জাহাজগুলোতে হামলার কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের দাম এই সপ্তাহে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চম তেল ও গ্যাস ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্য দিয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। ইরান জাহাজে আগুন লাগানোর হুমকি দেওয়ার পর প্রায় সব জাহাজ চলাচল বন্ধ।
এদিকে মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনী ওই অঞ্চলের জাহাজগুলোর সুরক্ষা দেবে। তিনি আরো বলেন, সব শিপিং কম্পানিকে যৌক্তিক মূল্যে ঝুঁকি বীমা দেবে, যাতে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ বাধাহীন থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলার পর শেয়ার বাজারও পড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক সকাল বেলায় ২০ মিনিট বন্ধ হয়, যা হঠাৎ বাজার পতন রোধ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি আগস্ট ২০২৪-এর পর প্রথমবার চালু হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান মতো রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোতে এই সংঘাত শেয়ারের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
অস্থিরতা
ইরানের বিপ্লবী প্রহরী বাহিনীর উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারি বলেছেন, ‘যদি শত্রু আমাদের প্রধান কেন্দ্রগুলোকে আঘাত করার চেষ্টা করে, আমরা পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে আঘাত করব।’ ইরান প্রতিবেশি আরব দেশগুলোতে, যেখানে মার্কিন ঘাঁটি আছে সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে জাহাজ চলাচলও বন্ধ হয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চম তেল ও এলএনজি যায়।
বিশ্বের প্রধান এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার উৎপাদন বন্ধ করেছে। অনেক ট্যাংকার প্রণালী অতিক্রম না করে উপসাগরে নোঙ্গর করছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় তেল পরিবহনের খরচ গত সপ্তাহ থেকে প্রায় চারগুণ বেড়ে দিনে ৪ লাখ ডলারের বেশি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলের ট্যাংকারগুলোর বীমা দেবে এবং প্রয়োজনে নেভি তাদের নিরাপদভাবে প্রণালী অতিক্রম করাবে।
বিমান চলাচলও বিঘ্নিত হয়েছে। এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকাকে সংযুক্ত করে এমন মধ্যপ্রাচ্যের বিমান কেন্দ্রগুলো বন্ধ। লেবাননে হিজবুল্লাহর সহযোগীরা ইসরায়েলের ওপর হামলা চালায়। জবাবে ইসরায়েল বিমান হামলা চালায় এবং দক্ষিণাঞ্চলে সেনা মোতায়েন বাড়ায়। বিস্ফোরণের শব্দে বেইরুত ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। অনেক মানুষ নিহত হয়েছে।
ইরান বলেছে, হামলায় মোট ৭৮৭ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধের প্রথম দিনে স্কুল বোমার ফলে ১৬৫ মেয়ে মারা গেছে। দক্ষিণ শহর মিনাবে শত শত মানুষ রাস্তায় জড়ো হয়। নিহত কন্যাদের ছোট কফিন ইরানি পতাকা দিয়ে ঢাকা। জাতিসংঘ মানবাধিকার অফিস এই হামলার তদন্ত দাবি করেছে এবং এটিকে ভয়ংকর বলে আখ্যায়িত করেছে।
যেখানে ইসরায়েলের কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে বলছেন, তারা ইরানের সরকার উৎখাত করতে চায়, সেখানে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, যুদ্ধের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের সীমান্তের বাইরে শক্তি প্রদর্শনের ক্ষমতা নষ্ট করা।
মঙ্গলবার বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে একটি বন্ধ বৈঠকে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি। তিনি স্বীকার করেছেন, যুদ্ধের পরও ইরানের সরকার টিকে থাকতে পারে, তবে পরে এটি ধ্বংস হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয় তৎক্ষণাৎ মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মতো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানিদের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ উৎখাত করতে বলেছেন। তবে মঙ্গলবার তিনি সাবধান থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আপনি যদি প্রতিবাদ করতে যান, এখন করবেন না। বাইরে যাওয়া খুবই বিপজ্জনক। ইসরায়েলে শনিবার থেকে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১০ জন নিহত হয়েছে, বারবার বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হচ্ছে। আগত আক্রমণের সতর্কবার্তায় মানুষ বোম শেল্টারে লুকাচ্ছে, আর প্রতিরোধের বিস্ফোরণের শব্দে ভবন কেঁপে উঠছে।
সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি
