সারা দেশে ৪০ শতাংশের বেশি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, চিহ্নিত করা হয়েছে যেভাবে

সিলেটের সময় ডেস্ক :

 

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে সারা দেশের ৪২ হাজারেরও বেশি ভোটকেন্দ্রে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশের ওপরে ভোটকেন্দ্রকে নানা কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।

এই নির্বাচনে সারা দেশের তুলনায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার ১৫টি আসনে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যাও বেশি বলে জানিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। পুলিশের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে তালিকা দেওয়া হয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার ২১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৬১৪টি ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ।

 

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সারা দেশের ভোটকেন্দ্রগুলোর অবস্থান, অতীত সহিংসতার তথ্যসহ নানা বিষয় বিবেচনায় রেখে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা তৈরি করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।

গত শনিবার সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ঢাকা-১৪, ১৬ ও ১৮ আসনের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে একটি ব্রিফিং করা হয়। সেখানে বলা হয়, ঢাকার দুইটি আসনকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ আসন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এবারও নির্বাচনের আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশন কয়েক দফায় বৈঠকও করেছে।

ঝুঁকিপূর্ণ এই কেন্দ্রগুলোকে পুলিশের ভাষায় বলা হয়ে থাকে গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। 

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘রিটার্নিং কর্মকর্তা যে সব কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করবে, সেখানে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইসির পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

পুলিশ বলছে, যে সব কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে বাড়তি পুলিশ, সিসি ক্যামেরা ও বডিওর্ন ক্যামেরাও থাকবে।

 

এবারের নির্বাচনে একই দিনে সারা দেশের ২৯৯টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে ওই আসনের ভোট স্থগিত করা হয়েছে গত সপ্তাহে। জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে বেশ কিছু বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচনের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী আসনভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা প্রস্তুত করে থাকে।

সাধারণত নির্বাচন কমিশন ভোটকেন্দ্রের তালিকা চূড়ান্ত করার পরই পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কয়েকটি মানদণ্ডকে সামনে রেখে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন্দ্রের তালিকা প্রস্তুত করে। এক্ষেত্রে, অতীতে যেসব কেন্দ্রে সহিংসতা, ভাঙচুর বা ব্যালট ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায় রাখা হয়।

 

কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভৌগলিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা তৈরি করা হয়। অর্থাৎ পার্বত্য অঞ্চল, দুর্গম চরাঞ্চল বা সীমান্তবর্তী এলাকার কেন্দ্রগুলোকেও রাখা হয় ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকায়। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বাড়ি কিংবা প্রভাবশালী কোনো রাজনৈতিক নেতার বাড়ির পাশে যদি কোনো ভোটকেন্দ্র থাকে, সেটিও রাখা হয় এই তালিকায়।

ভঙ্গুর যাতায়াত ব্যবস্থা কিংবা যে জায়গায় কোনো ধরনের সহিংসতা ঘটলে সহজে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী পৌঁছাতে পারে না, সেই কেন্দ্রগুলোকেও ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন্দ্রের তালিকায় রাখা হয়। এ ছাড়া যেসব ভোটকেন্দ্রে অবকাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের সীমানা প্রাচীর নেই সেই সব কেন্দ্রকেও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ঢাকার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ইউনুচ আলী বলেন, ‘সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা প্রস্তুত করে থাকেন। সেই অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয় নির্বাচন কমিশন।’ এবার নির্বাচনের আগেই ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা প্রস্তুত করে সেই অনুযায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাজানো হয়েছে।

ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কতগুলো কেন্দ্র?

ঢাকায় জেলা ও সিটি করপোরেশন মিলিয়ে মোট আসন রয়েছে ২০টি। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকায় রয়েছে ১৫টি সংসদীয় আসন। আর সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ঢাকা জেলায় আসন রয়েছে পাঁচটি। সেগুলো হলো ঢাকা-১, ঢাকা-২ ও ঢাকা -৩ এবং ঢাকা ১৯ ও ঢাকা-২০।

ঢাকার পুলিশ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ঢাকা জেলায় যে পাঁচটি আসন রয়েছে, তাতে মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৮৯৩টি। এর মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বা অধিক ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন্দ্র ধরা হয়েছে ৬৮টি ভোটকেন্দ্রকে। আর ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ধরা হয়েছে ৩২টিকে। বাকি ৭৯৩টি কেন্দ্র সাধারণ কেন্দ্র হিসেবেই বিবেচনা করছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।

তবে এবারের নির্বাচনে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি সিটি করপোরেশন এলাকার অধিভুক্ত ১৫টি আসন। নির্বাচন কমিশন থেকে প্রাপ্ত তালিকায় দেখা গেছে- ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার ২১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৬১৪টি ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ।

এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে ঢাকা ১৮ আসনে। এই আসনে ২১৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৮৯টি ঝুঁকিপূর্ণ। অন্য আসনগুলোর মধ্যে ঢাকা-৪ আসনের ১১৫টির মধ্যে ৯৩টি, ঢাকা-৫ আসনের ১৫০টির মধ্যে ১৩৬টি, ঢাকা-৬ আসনের ১০০টির মধ্যে ৭৯টি, ঢাকা-৭ আসনের ১৬৪টির মধ্যে ১১৮টি, ঢাকা-৮ আসনের ১০৮টির মধ্যে ৮৭টি, ঢাকা-৯ আসনের ১৬৯টির মধ্যে ১৩০টি, ঢাকা-১০ আসনের ১৩৬টির মধ্যে ৯০টি, ঢাকা-১১ আসনে ১৬২টির মধ্যে ১২৮টি, ঢাকা-১২ আসনে ১৩০টির মধ্যে ৭৩টি, ঢাকা-১৩ আসনে ১৩৮টির মধ্যে ১১০টি, ঢাকা-১৪ আসনে ১৫৩টির মধ্যে ১২৪টি, ঢাকা ১৫ আসনে ১২৭টির মধ্যে ৮৩টি, ঢাকা ১৬ আসনে ১৩৭টির মধ্যে ১১টি এবং ঢাকা ১৭ আসনের ১২৪টির মধ্যে ৬৩টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারে দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা থাকবে সাথে সিসিটিভি ইন্সটল করা হবে।

কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন থাকবে?

ঢাকাসহ সারা দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোর বেশিরভাগেই সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এ ছাড়া এসব কেন্দ্রে যারা পুলিশের দায়িত্ব পালন করবে তাদের সঙ্গে থাকবে বডিওর্ন ক্যামেরা। এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো সশস্ত্র বাহিনীকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সারা দেশে এক লাখেরও বেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য নির্বাচনী নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে বলা হয়েছে সারা দেশের ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে যেগুলো সাধারণ ভোটকেন্দ্র সেগুলোতে অস্ত্রসহ দুজন পুলিশ, আনসার ভিডিপি, গ্রাম পুলিশ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে।

মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরের যেসব কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে সেখানে তিন থেকে চারজন অস্ত্রসহ পুলিশ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন। তবে আনসার, ভিডিপি ও গ্রাম পুলিশের সংখ্যা একই পরিমাণে থাকবে। অন্যদিকে, মেট্রোপলিটন এলাকার মধ্যে যে সব ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে সেখানে অস্ত্রসহ পুলিশ থাকবে চারজন করে।

বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেছেন, এবারের নির্বাচনে সারা দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার পুলিশ কেন্দ্রের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবে। তাদের সঙ্গে সাপোর্টিং হিসেবে আরো ৩০ হাজার পুলিশ বাহিনীর সদস্য। পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, এবারের নির্বাচনে সারা দেশের পুলিশের ৮৮ শতাংশই নির্বাচনের মাঠে দায়িত্ব পালন করবে।

তিনি আরো জানান, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রগুলোতে ২৫ হাজারের বেশি বডিওর্ন ক্যামেরা থাকবে। এরমধ্যে ১৫ হাজার বডিওর্ন ক্যামেরা অনলাইন ও ১০ হাজার বডিওর্ন ক্যামেরা থাকবে অফলাইন।

এ বিভাগের অন্যান্য