জনতার কামরান: স্মৃতি, মানুষ ও অনুপস্থিতির ভার

বশির আহমদ জুয়েল

বদর উদ্দিন আহমদ কামরান—সিলেট রাজনীতির এক আলাদা উচ্চারণ। একজন মানুষ, একজন সংগঠক, একজন জনপ্রতিনিধি—কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে যেটি তাকে ইতিহাসে স্থান দিয়েছে, তা হলো তার মানুষ হয়ে থাকার ক্ষমতা। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র হিসেবে তিনি শুধু একটি সিটি প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্ব দেননি; তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন একটি নগরের মানসিকতাকে—সহযোগিতা, সৌজন্য, ভালোবাসা আর আস্থার রাজনীতিকে।

আজ তার জন্মদিনে তাকে স্মরণ করতে বসে মনে হয়—কিছু মানুষের মৃত্যুর পর অন্যরা বড় হয়ে ওঠেন।কামরান ভাই ঠিক তেমনই। করোনার নির্মম বিচ্ছেদ তাকে কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু তাকে ভুলতে পারেনি নগর, সমাজ এবং আমরা—যারা তাঁর স্নেহ, সৌজন্য ও সাহচর্য পেয়েছি।

রাজনীতির ভিড়ে একজন ভিন্ন চরিত্রের নাম কামরান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতার সঙ্গে জনতার দূরত্ব দিনদিন বেড়েছে। নেতা উন্নয়ন দেখান, কিন্তু জনতা মনে করে—“তিনি আমাদের কেউ নন।” কিন্তু কামরান ভাই ছিলেন ব্যতিক্রম। তার কাছে রাজনীতি ছিল কেবল দলীয় দায়িত্ব নয়—এটি ছিল মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার বাস্তব রূপ। তিনি পাঁচতারা অফিসে বসা নেতা ছিলেন না। সিলেটের অলিগলি, চায়ের দোকান, সাংস্কৃতিক আসর—সব জায়গায় তিনি ছিলেন অনায়াসে।

কেবল সিলেট নয় দেশে-বিদেশে অসংখ্য নাগরিক আজও বলেন, “কামরান ভাইয়ের দরজায় কাউকে ফিরতে হয়নি।” এই সহজ ও মানবিক আচরণ তাকে অন্যরকম করে তুলেছিল।

করোনার সময়ে কামরান ভাই চলে গেলেন পরলোকে—সে সময়ে মানুষের পাশে থাকা সবচেয়ে জরুরি মনে করেছিলেন তিনি। ছিলেনও সবার পাশে। আজও ভাবি, তিনি যদি বেঁচে থাকতেন?

আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যখন অনেক নেতা সংকট আসলে দূরে সরে যান, জনতার দুঃখ-কষ্টে পাশে না দাঁড়িয়ে “নিরাপদ আশ্রয়ে” চলে যান— তখন নিশ্চিতভাবে বলা যায়: কামরান ভাই পালাতেন না।
তিনি ছিলেন জনতার মানুষ; সঙ্কটের সময় মানুষের হাত ধরে দাঁড়ানোই ছিল তার রাজনৈতিক চরিত্র।
যত জেল-জুলুমই হোক, যত রাজনৈতিক ঝড়ই আসুক —তাঁর একটা স্থিরতা ছিল, যা অনেক নেতা হারিয়ে ফেলেছে। এই কারণেই আজ, তার অনুপস্থিতিতে, নগর আরও শূন্য লাগে।

কেবল রাজনীতি নয় সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তিনি। আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিতে আমি যখন সাহিত্য ও সংস্কৃতির কাজে ব্যস্ত ছিলাম, যখন লিখতাম, সংগঠন করতাম, ছড়াসাহিত্যের ছোটকাগজ ছন্দালাপ ও সাহিত্যপত্রিকা ২১শে বাঙলাসহ না প্রকাশনা করতাম তখনও তাঁর সহযোগিতা পেয়েছি খুব সহজে। যদিও এসব কাজে অনেক রাজনৈতিক নেতাই পাশে থাকেন না। সত্যি বলতে, রাজনীতিতে সংস্কৃতি চর্চাকে অনেকেই দেখেন “অপ্রয়োজনীয়” হিসেবে। কিন্তু কামরান ভাই দেখতেন ভিন্নভাবে। তাঁর জন্য সাহিত্য ছিল নরম শক্তি; সংস্কৃতি ছিল শহরের পরিচয়ের অন্তর্নিহিত অংশ।

ব্যক্তিবার্তায় আজ বলতে পারি, আমার যে কোনো সাফল্যে তিনি খুব খুশি হতেন। আমি বিশ্বাস করি যে,
সামান্য উৎসাহে মানুষ দিগন্ত পায়— তিনি সেই উৎসাহ দিতে জানতেন বড় উদারতায় ও আন্তরিকতায়।

আজ যখন ফিরে তাকাই, দেখি আমার পেশাগত ও সৃজনশীল পথচলায় তার হাসিমাখা মুখের সমর্থন কত বড় ভূমিকা রেখেছে। রাজনীতির রূপান্তর ও কামরানের অনুপস্থিতি সিলেটের রাজনীতি আজ অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতা বদলেছে, নেতৃত্ব বদলেছে, শহরের কাঠামো বদলাচ্ছে—কিন্তু মানুষের সঙ্গে নেতার দূরত্ব দিনদিন আরও বাড়ছে।

এই সময়ে বোঝা যায়—একজন কামরান ভাই কতোটা প্রয়োজন ছিল।তার বিশেষত্ব ছিল—তিনি দলের নেতা হয়েও দলমুখী ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানুষমুখী। যে কারণে বিরোধী দল, ভিন্ন মত, অন্য মতাদর্শের মানুষও তাকে সম্মান করত। যা আজও চলমান। রাজনীতিতে এই সৌজন্যের সংস্কৃতি আজ খুব কম।

জনতার অন্তরেই কামরান ভাইর স্থায়ী ঠিকানা একজন মানুষ মারা গেলে তার পরিবার কাঁদে,
কিন্তু একজন জননেতা মারা গেলে একটি নগর ও দেশ শোকাহত হয়। কামরান ভাই আমাদের সেই শোকের মানুষ। তার মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি নয়—মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক বিরল উদাহরণের অকাল পরিসমাপ্তি।

আজ প্রিয় কামরান ভাইর জন্মদিনে আমি শুধু একজন নেতা বা মেয়রকে নয়, একজন স্নেহশীল অভিভাবককে স্মরণ করি—যিনি ছিলেন আমার মতো অনেকের সাহস, অনুপ্রেরণা ও পথচলার নীরব প্রহরী।

রাজনীতিতে ক্ষমতা, পদ, প্রভাব—সবই ক্ষণস্থায়ী।
স্থায়ী হলো মানুষের ভালোবাসা, মানুষের স্মৃতি, মানুষের গল্প। বদর উদ্দিন আহমদ কামরান সেই গল্পেরই এক উজ্জ্বল চরিত্র। তিনি আজ নেই, কিন্তু জনতার কামরান আজও আছেন—মানুষের হৃদয়ে, স্মৃতিতে, অভাবের দীর্ঘশ্বাসে। তার জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অশেষ কৃতজ্ঞতা।

এ বিভাগের অন্যান্য