আগুনের রাজনীতিতে গণমাধ্যমের দায়
প্রতিবাদ ও প্রশ্ন—
আগুনের রাজনীতিতে গণমাধ্যমের দায়
বশির আহমদ জুয়েল
দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার অফিসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিন্দনীয় ও গভীর উদ্বেগজনক। সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে হামলা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক পরিসরের ওপর সরাসরি আঘাত। এ ধরনের সহিংসতার কোনো যুক্তি নেই, কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও জনগণের দায়িত্ব।
তবে প্রতিবাদের সঙ্গে সঙ্গে দায়ের প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত সন্ত্রাস ও রাজনৈতিক সহিংসতা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিলো না। এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি একটি সুসংগঠিত অস্থিতিশীলতার প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে দুর্বল করে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী চক্র, দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী এবং পরিচিত-অপরিচিত জঙ্গি শক্তিকে রাষ্ট্র পরিচালনার পথে এগিয়ে দেওয়ার জন্য নির্মিত এক সাঁকো। এই প্রক্রিয়ায় যারা রাস্তায় নেমে সহিংসতা চালিয়েছে, তাদের পাশাপাশি যারা বয়ান নির্মাণ করেছে, নীরব থেকেছে বা ঘটনাকে ‘ট্রানজিশন’ ও ‘অনিবার্য পরিবর্তন’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে—তারাও দায় এড়াতে পারে না।
এই প্রেক্ষাপটে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো প্রভাবশালী গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। জুলাইয়ের সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় শক্তির ব্যবহার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সংকোচনের বিষয়গুলো তারা যে সীমিত ও সংযত ভাষায় উপস্থাপন করেছে, তা বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র তুলে ধরেনি। বরং অনির্বাচিত ক্ষমতা কাঠামোর জন্য এক ধরনের সামাজিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে তা সহায়ক হয়েছে—এ অভিযোগ অমূলক নয়।
সংবাদমাধ্যম সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনা না করলেও জনমত নির্মাণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার পথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই জায়গা থেকেই বলতে হয়—জুলাই সন্ত্রাসের পর যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, সেখানে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের নৈতিক ও ঐতিহাসিক দায় অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান যেমন জরুরি, তেমনি নীরবতা, অসম্পূর্ণ সত্য ও দায়িত্বহীন বয়ানের বিরুদ্ধেও স্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন। গণতন্ত্র আগুনে রক্ষা পায় না, আবার নীরবতায়ও নয়। গণতন্ত্র টিকে থাকে সত্য, প্রশ্ন এবং জবাবদিহির ওপর—সেই দায় থেকেই এই প্রতিবাদ ও এই প্রশ্ন।
