স্বাগতম বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

বশির আহমদ জুয়েল

রক্তে রঞ্জিত যে স্বদেশ আমরা পেয়েছি, তা কোনো পরাধীন শক্তির দয়া নয়—এ অর্জন আমাদের আত্মত্যাগের, সাহসের এবং সংগঠিত প্রতিরোধের ফল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে ডিসেম্বর তাই শুধু একটি মাস নয়; এটি বাঙালি জাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়, আমাদের আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি। ডিসেম্বর এলেই তাই বাঙালির হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারিত হয়—স্বাগতম বিজয়ের মাস ডিসেম্বর।

আজ ১ ডিসেম্বর। এই দিনটিই বাঙালির মহান বিজয়ের যাত্রার শুরুর নতুন অধ্যায়। ১৯৭১ সালের এই দিনে দেশের সর্বত্র মুক্তিযোদ্ধারা শুরু করেছিলেন সর্বাত্মক আক্রমণ—যা শেষ হয় ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে।

ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকেই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের পদধ্বনি ছিল বিজয়ের বার্তা। শহর, বন্দর, গ্রাম—সবখানে তখন ধ্বনিত হচ্ছিল স্বাধীনতার শ্লোগান। পাকসেনারা ক্রমশ পিছু হটছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আঘাতে। সিলেটেও পরিস্থিতি ছিল একইরকম; স্বাধীনতার পতাকা ছড়িয়ে পড়ছিল এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায়।

সিলেটের কানাইঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকবাহিনীর ভয়াবহ লড়াইয়ে ৩০ জন পাকসেনা ও রাজাকার নিহত হয়—এ অঞ্চলটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গৌরবময় অবদান রেখেছে। জুড়ি ও বড়লেখা এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের অবিরাম প্রতিরোধে পাকবাহিনী তাদের ভারী কামান সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। ডিসেম্বরের প্রথম দিনের এই সর্বাত্মক আক্রমণই বাঙালির বিজয়যাত্রাকে আরও বেগবান করে তোলে, যা ১৬ ডিসেম্বর গিয়ে পরিণত হয় স্বাধীনতার সোনালি সূর্যালোকে।

ডিসেম্বরের ১ তারিখ এলেই পুরো বাংলাদেশ জুড়ে শুরু হয়ে যায় উৎসব, স্মরণ ও গর্বের নানা কর্মসূচি। যদিও এবার অনেক ব্যতিক্রম ও হতাশার। সাধারণত রাজধানী ঢাকার আলোয়-আঁধারিতে শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ—সব জায়গায় শুরু হয় শ্রদ্ধা জানানোর প্রস্তুতি। বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামেও মানুষ নতুন উদ্যমে স্মরণ করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ। স্কুল-কলেজের শিশুদেরও শেখানো হয়—কি ছিল মুক্তিযুদ্ধ, কেন আমরা লড়েছিলাম, কাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা।

মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন বাংলার সূর্যসন্তান। তাদের আত্মদানে আজকের বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে স্বাধীন পতাকার নিচে। আগামী প্রজন্ম যেন এই ইতিহাস ভুলে না যায়—সেজন্যই ১ ডিসেম্বর আসে আমাদের মনে করিয়ে দিতে কে আমরা, কোথা থেকে এসেছি, আর কোন মূল্যে আমরা পেয়েছি আমাদের স্বাধীনতা।

নয় মাসের যুদ্ধের রক্তাক্ত দিনগুলো শুধু ইতিহাস নয়; এগুলো আমাদের অস্তিত্বের শিকড়। ত্রিশ লক্ষ শহীদ, দুই লক্ষ নির্যাতিত মা-বোন, আগুনে পোড়া অসংখ্য গ্রাম—এ সব কিছুর বিনিময়ে আমরা পেয়েছি লাল-সবুজের সেই পতাকা। স্বাধীনতার জন্য যে আত্মত্যাগ, তা কোনো দানের বস্তু নয়। এই পতাকা কারো করুণা বা সদকার ফল নয়; এটি বাঙালির আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।

আমাদের পূর্বপুরুষরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। কেউ দেখেছেন সহযোদ্ধার মৃত্যুর দৃশ্য, কেউ হয়েছেন নির্যাতনের শিকার, কেউ আবার জন্ম দিয়েছেন সন্তানকে যুদ্ধের আগুনের মধ্যে। একাত্তরের মা-বোনেরা সহ্য করেছেন অকথ্য নির্যাতন—যা আজকের দিনের ঝড়, সাইক্লোন কিংবা টর্নেডোর চেয়েও ভয়াবহ ছিল।

তবুও তারা হার মানেননি। তাদের বুকের সাহসের ভরসাতেই বাংলায় সূর্য উঠেছে স্বাধীনতার আলো নিয়ে। তবে সব অর্জন সত্ত্বেও আজও সর্বজনস্বীকৃত একটি অবিকৃত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা হয়নি।
দুঃখজনক হলেও সত্য—যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিলেন, তাদের অনেকেই নানা সময়ে তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত অবদান অনেক সময় মূল্যায়িত হয়নি, আর নকল সনদধারীরা দাপিয়ে বেড়িয়েছে। এসব অন্যায় শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা নয়—এ জাতির ইতিহাসকেও ধোঁয়াশার মধ্যে ফেলে।

একাত্তরের পর জন্ম নেওয়া তরুণরা আজ সঠিক ইতিহাস জানতে চায়। তারা জানতে চায় বিজয়ের প্রকৃত গল্প, জানতে চায় কিভাবে শত্রুর বেয়নেটের সামনে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধারা বুক চিতিয়ে লড়েছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়—এই ইতিহাস রচনায় আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে অনেক উদাসীনতা রয়েছে।

ডিসেম্বর শুধু আনন্দের মাস নয়—এটি আত্মসমালোচনারও মাস। আমরা কি সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করছি?
আমরা কি ইতিহাসকে রক্ষা করছি?
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কি যথাযথ সম্মান দেখাতে পেরেছি? এসব প্রশ্ন প্রতিটি ডিসেম্বরেই আমাদের সামনে আসে।

এই ডিসেম্বরের শুরুতে আমাদের প্রত্যেকের উচিত—অন্তত একবার উচ্চারণ করা:
“স্বাগতম বিজয়ের মাস ডিসেম্বর।”

এই উচ্চারণ শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি এক ধরনের অঙ্গীকার—
যে অঙ্গীকার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বাঙালি জাতির সংগ্রাম, ত্যাগ, রক্ত, চোখের জল এবং স্বপ্নের গল্প।

আমরা যেন ভুলে না যাই—
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় অহংকার, আমাদের আত্মপরিচয়।যে ইতিহাসে রয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্তের দাগ, তাদের জীবনের চিহ্ন, অগ্নিঝরা দিনগুলোর স্মৃতি। যে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বিশ্বদরবারে।

লাল-সবুজের পতাকা আমরা পেয়েছি ত্যাগের বিনিময়ে। এ পতাকা আমাদের পথ দেখায়, আমাদের শক্তি জোগায়। ডিসেম্বর তাই কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা ও বিজয়ের মাস— এই মাস আমাদের শেখায়,
আমরা কখনো পরাজিত নই, আমরা বীরের জাতি।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
স্বাগতম বিজয়ের মাস—ডিসেম্বর।

এ বিভাগের অন্যান্য