টাঙ্গুয়ার হাওর ও আহাম্মদ কবিরের মিতালী

বশির আহমদ জুয়েল

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রকৃতি যেন এক অদ্ভুত মোহে আবদ্ধ। বর্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওর পরিণত হয় অন্তহীন জলরাশির রাজ্যে, আর হেমন্তে সেখানে দেখা মেলে অসীম সবুজের বর্ণিল কারুকাজ। রামসার সাইট হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এ জলাভূমিকে দেশের প্রকৃতিপ্রেমীরা যেমন ভালোবাসেন, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি ভালোবাসা বয়ে চলে হাওরপাড়ের মানুষদের হৃদয়ে। জয়পুর, গোলাবাড়ি ও ছিলানী তাহিরপুর—এই তিনটি গ্রাম যেন টাঙ্গুয়ার হাওরের সঙ্গে জন্মসূত্রে জড়িত। হাওর তাদের কাছে শুধু প্রকৃতির এক অপার সৌন্দর্য নয়; বরং জীবনের অংশ, বেঁচে থাকার অবলম্বন, এক গভীর আবেগের নাম।

রাজধানীসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ টাঙ্গুয়ার হাওরে ছুটে আসে—পর্যটন, ছবি, নৌভ্রমণ কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার উন্মাদনা নিয়ে। অনেকে আবার হাওরের নামে বাণিজ্যিক উদ্যোগেরও সীমা নেই—ট্যুর কোম্পানি, রিসোর্ট বা লাভজনক প্রকল্প। কিন্তু হাওরপাড়ের প্রকৃত মানুষগুলোর উন্নয়ন কোথায়?
যে মানুষগুলো হাওরকে মা-বাবা বা সন্তানের মতো আগলে রাখেন, তাদের জীবনে উন্নয়নের আলো খুব বেশি পৌঁছায়নি। বরং হাওরের নাম ভাঙিয়ে কেউ কেউ সংগঠন গড়ে তোলেন, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সখ্যতা তৈরি করেন, কিন্তু হাওরপাড়ের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতেও দেখা যায় না। কিছু সুবিধাভোগী তো হাওরের স্বার্থ বিসর্জন দিতে পর্যন্ত কুণ্ঠিত নয়।

হাওর রক্ষা ও উন্নয়নে বিগত সময়ে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। টাঙ্গুয়ার হাওরকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে কমিউনিটি-বেইজড ম্যানেজমেন্ট মডেল, যা স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে তাদের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি হাওর সংরক্ষণেও সচেষ্ট ছিল।
কিন্তু প্রকল্পের একটি সীমাবদ্ধতা থাকে সময়। প্রকল্প শেষ হলে কাজও শেষ—সাথে কাজ হারান হাওরপাড়ের বহু তরুণ, যারা নিবেদিতপ্রাণভাবে মাঠে কাজ করতেন।

জয়পুর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের দ্বিতীয় পুত্র আহাম্মদ কবির যেন জন্ম থেকেই হাওরের সন্তান। হাওরের বাতাসে বড় হওয়া এই তরুণের হৃদয়ে হাওর শুধু পেশা নয়, প্রাণের অংশ। পেশাগত জীবনে তার শুরুটা ২০০৮ সালে, টাঙ্গুয়ার হাওর সমাজভিত্তিক টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে কমিউনিটি ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সে দায়িত্ব পালন করেছে সিএনআরএস পরিচালিত টাঙ্গুয়ার হাওর কেন্দ্রীয় সহব্যবস্থাপনা কমিটির কোষাধ্যক্ষ হিসেবে।
এছাড়াও সে দায়িত্ব পালন করেছে কমিউনিটি গার্ড সুপারভাইজার হিসেবে—যেখানে তার কাজ ছিল হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে স্থানীয়দের সংগঠিত রাখা। সর্বশেষ ২০১৫–২০১৬ সাল পর্যন্ত সে ছিল টাঙ্গুয়ার হাওর প্রকল্পে ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর।
কাজের মাধ্যমে সে শুধু প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আস্থা অর্জন করেনি, বরং হাওরপাড়ের সাধারণ মানুষের ভালোবাসাও পেয়েছে অন্তহীন।

প্রকল্পগুলো শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেকের মতো সেও কাজ হারিয়েছে। কিন্তু অন্যদের মতো বসে যায়নি। সরকারি চাকরি কিংবা বড় কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকলেও সে হাওর ছাড়েনি।
বরং এখনো যারা হাওর দেখতে আসেন, তাদের গাইড হিসেবে সঠিক, নির্ভরযোগ্য ও মানবিক সেবা দিয়ে হাওরের আসল রূপটাই তুলে ধরছে অনর্গল। পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় সংবাদকর্মী হিসেবেও কাজ করছে দাপটের সাথে।

সরকার টাঙ্গুয়ার উন্নয়নে নতুন কোন কর্মসূচি নেওয়ার প্রস্তুতি নিলে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক হবে। তবে একই সঙ্গে কিছু সুবিধাবাদী মহলও সক্রিয় হয়ে উঠেবে—প্রকল্প ভোগ, বিদেশি ফান্ড, ‘হাওর কাজের’ নামে নিজেদের উন্নয়ন—এসবই হবে তাদের লক্ষ্য।
অথচ টাঙ্গুয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেই মানুষদের উপর, যারা সত্যিকার অর্থে হাওরকে ভালোবাসে—যারা হাওরে জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে এবং হাওরের জন্য আজীবন কাজ করেছে।

আহাম্মদ কবিররা হাওরকে বাণিজ্যের চোখে দেখেন না। তাদের চোখে হাওর হলো বেঁচে থাকার অবলম্বন, ভালোবাসা, দায়িত্ব। তাই বলা যায়—টাঙ্গুয়ার হাওর ও আহাম্মদ কবিরের বন্ধন জন্মসূত্রে গড়া, সত্তায় মাখা।

টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন স্থানীয়দের অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই হবে না। কারণ যাদের জীবন-জীবিকা হাওরের সঙ্গে মিশে আছে, তারাই জানে হাওরের প্রকৃত প্রয়োজন কী।

উড়ে এসে জুড়ে বসারা ফেসবুক পোস্টে হাওরের প্রেম দেখাতে পারে, কিন্তু সংকটের মুহূর্তে তারাই সবার আগে পালায়। অথচ আহাম্মদ কবিরের মতো মানুষরা হাওরের প্রয়োজনে জীবন দিতেও পিছপা হবে না—এটাই বাস্তবতা। সুতরাং হাওরের প্রকৃত বন্ধুদের প্রাপ্য সম্মান, সুযোগ ও মূল্যায়ন দেওয়া—এটাই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্ব।

এ বিভাগের অন্যান্য