রাজাহীন রাজ্যে ছড়ার হাহাকার ও ছড়ার রাজা দিলওয়ার
বশির আহমদ জুয়েল
২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর এই দিনে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন দিলওয়ার। যার নামের আগে অনেক বিশেষনই রয়েছে। দিলওয়ার, ছড়ার রাজা দিলওয়ার বা গণমানুষের কবি দিলওয়ার। এ রকম অনেক বিশেষণেই রয়েছে তাঁর। স্বনামধন্য একজন গীতিকবি হিসেবেও তাঁর নাম থেকে যাবে অনন্তকাল। কালের ধারাবাহিকতায় জীবিতকালে আমরা যাঁদের চিনতে পারি না, তাঁদের চেনার চেষ্টা করি মরার পরে। ছড়াসাহিত্যের অগ্নিপুরুষ দিলওয়ার যখন ছড়া লিখে দেশে-বিদেশে কাঁপিয়েছেন তখন আমার মত অনেকের জন্মই হয় নি। এপার বাংলা ওপার বাংলায় সমানতালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অসংখ্য ছড়া। এ জন্য স্বীকৃতিও পেয়েছেন অনেক। ছড়ার রাজা হিসেবে দিলওয়ারের নাম-ডাক রয়েছে দেশে-বিদেশে। ১৯৬৪-৬৫ সালে সত্যজিত রায় সম্পাদিত সন্দেশ পত্রিকায় তাঁর ছড়া ছাপা হতো নিয়মিত। সাথে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ছোটদের পত্রিকা ‘শুকতারা’য়ও লিখেছেন নিয়মিত। যা তখন বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা পাঠ করতো নিয়মিত।
গণমানুষের কবি দিলওয়ার-এর-
‘পদ্মা-মেঘনা সুরমা যমুনা গঙ্গা কর্ণফুলী,
তোমাদের বুকে আমি নিরবধি গণমানবের তুলি’
এই শাশ্বত উচ্চারণের মাধ্যমে সিলেটের প্রাণ, ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম সাক্ষী লর্ডক্বীন কর্তৃক নির্মিত ক্বীনব্রীজকে নিয়ে লেখা তাঁর কবিতা ‘ক্বীনব্রীজের সূর্যোদয়’ এবং তাঁরই লেখা ‘তুমি রহমতের নদীয়া’ গানটি সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
সুরমা নদীর দক্ষিণ পারে ভার্থখলায় রক্ষণশীল পরিবারে ১৯৩৭ সালের ১ জানুয়ারি দিলওয়ার জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি দৈনিক সংবাদ-এর সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে দু’বছর কাজ করার পর ফিরে আসেন সিলেটে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি চলে যান ঢাকায়। ১৯৭৩-৭৪ সালে দৈনিক গণকন্ঠের সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকাস্থ রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত মাসিক উদয়ন পত্রিকার সিনিয়র অনুবাদক হিসেবেও কিছুদিন কাজ করেন।
কবি দিলওয়ার-এর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে ঐকতান, পুবাল হাওয়া, উদ্ভিন্ন উল্লাস, স্বনিষ্ঠ সনেট, রক্তে আমর অনাদি অস্থি, নির্বাচিত কবিতা, দিলওয়ারের একুশের কবিতা, বাংলা তোমার আমার, দিলওয়ারের শত ছড়া ও ছড়ায় অ আ ক খ অন্যতম। এ ছাড়াও দিলওযার রচনা সমগ্র ২য় খন্ড পর্যন্ত প্রকাশ হয়েছে। ২০০৮ সালে তাঁকে একুশে পদক প্রদান করা হয়। ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর প্রত্যাশা ছিলো তাঁর লেখা কবিতা বা ছড়া পাঠ্যপুস্তকে স্থান পাবে। কিন্তু তা আর হয় নি। বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন ‘গণমানুষের কবি’ হিসেবে। অনেক কবিই হয়তো জানতেন না বা জানেন না যে, কবি দিলওয়ার-ই ছড়ার রাজা। বিশেষ করে বাংলাদেশের সকল ছড়াসাহিত্যিকই তাঁর জন্য গর্ববোধ করেন। ছড়াসাহিত্যের একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে আমার গর্ব করাটা অন্যদের চেয়ে তুলনামূলক বেশি। কারণ আমার ছড়াসাহিত্যে হাতেখড়ি ছড়ার রাজধানী সিলেটে। ব্যতিক্রম ধারার ছড়াসাহিত্য সংগঠন ছড়া নিকেতন সিলেট এর প্রকাশনা ছড়াসাহিত্যের ছোটকাগজ ‘ছন্দালাপ’ সম্পাদনা করছি বেশ ক’বছর ধরে। সে সুবাধে দেশের সকল ছড়াসাহিত্যিকদের সাথে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি নিয়মিত। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে কিছু করার জন্য উদ্যোগী হই। সাথে সাথে পরামর্শ করি ছাড়াসাহিত্যের বরপুত্র লুৎফর রহমান রিটন ও ছড়া নিকেতেন সিলেট এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক বিধুভূষন ভট্টাচার্যের সাথে। তাঁদের মতামত নিয়েই সিদ্ধান্ত নিই যে, ছন্দালাপ দিলওয়ার সংখ্যা প্রকাশের। অল্প সময়ের আহবানে দিলওয়ারকে নিবেদিত লেখা পেয়ে আমি অবিভুত হয়ে যাই। সত্যিই দিলওয়ারের প্রতি ছড়াসাহিত্যিকদের ভালোবাসার কাছে আমি পরাজিত হই। নভেম্বর ২০১৩ এর মধ্যেই দিলওয়ার সংখ্যা প্রকাশ করতে সক্ষম হই। সত্যি কথা বলতে ছন্দালাপ ৬ষ্ঠ সংখ্যাটি ছিলো দিলওয়ার সংখ্যা। যা তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে প্রথম প্রকাশনা। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, তখন পর্যন্ত এই ছড়ার রাজার একটি ছড়া বা কবিতা দেশের কোন পাঠ্যুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। যা জাতি হিসেবে আপনার আমার সকলের জন্য লজ্জার।
যার ফলে ‘ছন্দালাপ’ দিলওয়ার সংখ্যার সম্পাদকীয়তে দাবী ছিলো এরকম- ‘আমরা যারা ছড়াসাহিত্য নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করি বা দু’চার লাইন লিখি তাদের প্রত্যেকের পক্ষ থেকে এ দাবীটি আজ সরকারের প্রতি জোরালোভাবে করতে চাই. ছড়ার রাজা ও গণমানুষের কবি দিলওয়ারের লেখা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। যা কেবল আমাদের দাবি-ই নয়,বরং দেশ ও জাতির দায়িত্বও বটে।’
দিলওয়ারকে নিয়ে রয়েছে নানা জনের নানা মত। তা নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই। আমি কেবল বলবো দিলওয়ার ছড়াসাহিত্যকে যা দিয়েছেন সে তুলনায় আমরা তাঁর জন্য কিছুই করি নি। আমার সম্পাদনায় ‘ছন্দালাপ’ দিলওয়ার সংখ্যা প্রকাশ ছড়াসাহিত্যের ঋনশোধ নয়; তা কেবল ছিলো একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। দিলওয়ারকে নিয়ে অনেকেই অনেক কিছু করেছেন কিন্তু তাঁকে নিয়ে তাঁর মৃত্যুর পর ছন্দালাপ-ই প্রথম প্রকাশনা হওয়ায় তৃপ্তির সাদ পেয়েছি।
ছড়ার রাজার লেখা বর্তমানে পাঠ্যপুস্তকে স্থান পেয়েছে। এটা অবশ্যই আমার ও আমাদের জন্য আনন্দের সংবাদ। দুঃখ কেবল একটাই ছড়ার রাজা ও গণমানুষের কবি তা দেখে যেতে পারেন নি। উচ্চ মাধ্যমিকের বাংলা পাঠ্য বইয়ে দিলওয়ারের ‘রক্তে আমার অনাদি অস্থি’ কবিতাটি স্থান পেয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতার মধ্যে এ কবিতাটি অন্যতম।
দিলওয়ারের মৃত্যুর পর ছড়ার রাজধানী সিলেটে রাজাহীন রাজ্যে চলছে ছড়ার হাহাকার। আমার এ কথার সাথে অনেকেই সহমত পোষণ করবেন। তবে কেউ কেউ ছাড়া। আমরা ছড়ার রাজাকে হারিয়েছি। কিন্তু ছড়ার রাজধানীতে বাস করেও ছড়ার লালন করছি না যথাযথভাবে। আমরা যারা ছড়াসাহিত্য নিয়ে কাজ করছি তারাও কোনো উদ্যোগী হচ্ছি না দিলওয়ারের ছড়াকে পাঠুপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে। সুতরাং সিলেটের ছড়াসাহিত্য ভুবনে যে বর্তমানে খরা যাচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজাহীন রাজ্যে দুর্ভোগ থাকাটা অস্বআভাবিক নয়। তবে এ দুর্ভোগ যেনো দীর্ঘ না হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে। রাজাকে হারিয়েছি আমরা এক যুগ হয়ে গেলো। কিন্তু এ সময়ে ছড়ার রাজধানী সিলেটে ছড়াসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়েছে বলে মনে হয় না। অথচ সিলেটে রয়েছে অনেকগুলো ছড়াসাহিত্য সংগঠন। প্রতিটি সংগঠনের সাথে রয়েছেন প্রতিষ্ঠিত ছড়াসাহিত্যিকগন। কাজেই ছড়াসাহিত্যে সিলেটের যে সুনাম রয়েছে তা ধরে রাখার দায়িত্বটা বর্তমানদের নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে এককভাবে কাজ করাটা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। সুতরাং সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায়ই এগিয়ে যেতে হবে আগামীর পথে।
ছড়ার রাজা দিলওয়ারের আজ প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর প্রতি আমার ব্যক্তিগত নির্ণয়হীন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাসহ সকল ছড়াসাহিত্যিকদের পক্ষে বিনম্র শ্রদ্ধা।
বশির আহমদ জুয়েল, সম্পাদক – ছন্দালাপ।
