ছাত্রসংগঠনের আত্মপ্রকাশের সময় হাতাহাতি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিটকে ধারণ করে ‘শিক্ষা ঐক্য মুক্তি’ মূলনীতি সামনে রেখে যাত্রা শুরু করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের ছাত্রসংগঠন ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ।’
গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে বিকেল ৩টায় সংবাদ সম্মেলন করে আত্মপ্রকাশের কথা থাকলেও নতুন ছাত্রসংগঠনটি সম্পূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক (ঢাবি) করার অভিযোগ তুলে সেখানে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভ থেকে সেটি পরে হট্টগোল, হাতাহাতি, বিশৃঙ্খলায় রূপ নেয়। আর এভাবেই যাত্রা শুরু হয়েছে নতুন এই ছাত্রসংগঠনটির।
আত্মপ্রকাশের দিন কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ১২ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়। কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে ঢাবির ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদারকে। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌহিদ সিয়ামকে। কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্যসচিব হিসেবে আছেন ঢাবির ইতিহাস বিভাগের জাহিদ আহসান, সিনিয়র সদস্যসচিবের পদ পেয়েছেন ঢাবির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের রিফাত রশীদ, মুখ্য সংগঠক হয়েছেন ঢাবির বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের তাহমিদ আল মুদ্দাসসির চৌধুরী, মুখপাত্র করা হয়েছে ঢাবির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের আশরেফা খাতুনকে।
বিকেল ৩টায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন এই ছাত্রসংগঠনের আত্মপ্রকাশের কথা থাকলেও সংবাদ সম্মেলন শুরু হওয়ার স্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসে তাঁদের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়েছে বলে বিক্ষোভ শুরু করেন। সংবাদ সম্মেলন শুরু করতে বাধা দিতে তাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে মধুর ক্যান্টিনের ভেতরে এবং বাইরে হট্টগোল করেন।
এ সময় তাঁরা ‘রিফাত রশীদ ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘ঢাবির সিন্ডিকেট, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘উত্তরায় বৈষম্য, মানি না মানব না’, ‘প্রাইভেটের অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘দুঃসময়ের রিফাত ভাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
বিকেল ৩টা থেকে এমন স্লোগান ও বিক্ষোভ চলতে থাকলে নতুন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) ভবনের দ্বিতীয় তলায় বৈঠক করতে থাকেন। এক পর্যায়ে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে নতুন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা ডাকসু ভবন থেকে বের হয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
এ সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্যে আহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীমউদ্দীন হলের ১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী আকিবুল হোসেন, সূর্যসেন হলের ইসলামিক হিস্ট্রি বিভাগের শিক্ষার্থী রিয়াজ উদ্দিন ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুহাস আলী মিশু। তাঁরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং শহীদ মোর্তজা মেডিক্যালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন বলে জানা যায়।
অপ্রীতিকর এই ঘটনা সম্পর্কে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যসচিব জাহিদ আহসান বলেন, ‘আজ যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটি সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত একটি ঘটনা। আমরা নতুন একটি ছাত্রসংগঠন করেছি। ছাত্রসংগঠনটি তার নিজস্ব নিয়ম অনুয়ায়ী চলবে। আমাদের মাত্র ছয় সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিদ্রুত আমরা দেশের সব সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করব। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেছে ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট ধারণ করে এমন কাউকে অবমূল্যায়ন করা হবে না৷’
রাজধানীর উত্তরা থেকে আসা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইকবাল হাসান বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানে উত্তরায় আমাদের এক শর ওপর আন্দোলনকারী শহীদ হয়েছেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আমাদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু নতুন এই দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে আমাদের কাউকে রাখা হয়নি। কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা এ কমিটি মানি না। আমরা আমাদের মূল্যায়ন চাই।’
সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ
‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’ নামে নতুন ছাত্রসংগঠনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব না রাখা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মারধরের প্রতিবাদে রাজধানীর বাংলামোটর মোড়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় তাঁরা এই অবরোধ শুরু করেন।
এদিকে নতুন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে কমিটি গঠনের সুরাহা করতে আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মেনে নেওয়া না হলে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সারা ঢাকা ব্লকেড কর্মসূচি পালন করবেন বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
অবরোধকারীদের মধ্যে সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কাজী ইমাম হোসাইন বলেন, ‘এই সংঘর্ষে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ জন আহত হয়েছেন। এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হিসেবে নতুন ছাত্র সংগঠনের কমিটিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের না রাখার জন্য।’
নতুন ছাত্রসংগঠনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব না রাখা এবং মারধরের প্রতিবাদে গত রাতে বাংলামোটর মোড়ে অবরোধ করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
