জিলহজ মাসের গুরুত্বপূর্ণ আমল
হিজরি সালের ১২তম মাস জিলহজ। মহান আল্লাহ এই মাসের প্রথম ১০ দিনকে বিশেষভাবে সম্মানিত করেছেন। এ সময়ে আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা প্রান্তরে সারা বিশ্বের মুসলিমরা এসে জড়ো হয়। কোরআন ও হাদিসে এ মাসের বিশেষ মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে।
বিভিন্ন হাদিসে জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমলের কথা এসেছে।
এক. চুল ও নখ না কাটা : জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি দেওয়া পর্যন্ত হাত ও পায়ের নখ, মাথার চুল কাটা বা মুণ্ডানো, মোচ ছোট করা বা কাটা, নাভি ও বগলের নিচের অযাচিত পশম না কাটা উত্তম। জিলহজ মাস শুরুর আগেই এসব বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা জিলহজ মাসের নতুন চাঁদ দেখলে এবং তোমাদের কেউ কোরবানির ইচ্ছা করলে সে যেন নিজের চুল ও নখের কোনো কিছু না কাটে। (মুসলিম, হাদিস : ১৯৭৭)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি কোনো জন্তু কোরবানি দেবে সে যেন জিলহজ মাসের নতুন চাঁদ দেখার পর নিজের চুল ও নখ থেকে কোনো কিছু স্পর্শ না করে।
কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য নেই এমন ব্যক্তি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এ আমল করে তিনিও কোরবানি দেওয়ার পূর্ণ সওয়াব পাবেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ এই উম্মতের জন্য কোরবানির দিনকে ঈদ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল, আমি যদি দুগ্ধবতী ছাগল ছাড়া অন্য কোনো পশু না পাই তাহলে কি কোরবানি করব? তিনি বললেন, না। বরং তুমি (ঈদের দিন কোরবানির পর) তোমার চুল ও নখ কাটবে। গোঁফ ছোট করবে।
দুই. রোজা রাখা : জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিন রোজা রাখা সুন্নত। এসব দিনে রোজার বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। হাফসা (রা.) বর্ণনা করেছেন, চারটি আমল নবী করিম (সা.) কখনো ছাড়তেন না। আশুরার রোজা, জিলহজের প্রথম দশকের রোজা, প্রতি মাসের তিন দিনের রোজা, ফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নত নামাজ। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ২৪১৫)
আর ৯ জিলহজ তথা আরাফার দিন রোজা রাখলে আগে ও পরে এক বছর গুনাহ মাফ হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আরাফার দিন (৯ জিলহজ) রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে তিনি এর মাধ্যমে বিগত এক বছর ও আগামী বছরের গুনাহ মাফ করবেন। (মুসলিম, হাদিস : ১১৬২)
তিন. জিকির করা : জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন বেশি পরিমাণ জিকিরের কথা হাদিসে এসেছে। বিশেষত তাকবির (আল্লাহু আকবার), তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ), তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) ও তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ) পড়া সুন্নত। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কাছে কোনো দিবস ও তাতে আমল করা জিলহজ মাসের ১০ দিনের চেয়ে অধিক প্রিয় মর্যাদাপূর্ণ নয়। অতএব তোমরা তাতে বেশি পরিমাণ জিকির লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও আলহামদুলিল্লাহ পড়ো। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৫৪৪৬)
চার. তাকবির পাঠ : জিলহজ মাসের প্রথম দিন থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত তাকবির পাঠ করা একটি সাধারণ আমল। তবে জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজরের নামাজ থেকে ১৩ তারিখ আসরের নামাজ পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ শেষে তাকবির বলবে। এটাকে তাকবিরে তাশরিক বলা হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ কোরো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২০৩)
ইবনে আববাস (রা.) বলেছেন, এখানে ‘নির্দিষ্ট দিন’ বলতে (জিলহজ মাসের) প্রথম ১০ দিন উদ্দেশ্য করা হয়েছে। ইবনে ওমর (রা.) ও আবু হুরাইরা (রা.) এই ১০ দিন তাকবির বলতে বলতে বাজারের দিকে যেতেন এবং তাদের তাকবিরের সঙ্গে অন্যরাও তাকবির বলত। মুহাম্মাদ বিন আলী (রহ.) নফল নামাজের পরও তাকবির বলতেন। (বুখারি, হাদিস : ৯৬৯)
তাকবির হলো, ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ অর্থ : আল্লাহ বড় আল্লাহ বড়, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আল্লাহ বড় আল্লাহ বড়। সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য। (দারু কুতনি, হাদিস : ১৭৫৬)
পাঁচ. হজ ও ওমরাহ করা : পবিত্র হজ ও ওমরাহ জিলহজ মাসের অন্যতম আমল। নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে জীবনে একবার হজ করা ফরজ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে আল্লাহর জন্য হজ করে এবং তাতে অশালীনতা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকে, সে হজ থেকে নবজাতক শিশুর মতো (নিষ্পাপ হয়ে) ফিরে আসে। (বুখারি, হাদিস : ১৫২১)
অন্য হাদিসে এসেছে, ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা ধারাবাহিকভাবে হজ ও ওমরাহ পালন কোরো, অর্থাৎ সঙ্গে সঙ্গে কোরো। তা এমনভাবে মুমিনের দরিদ্রতা ও পাপ মোচন করে, যেমন (কামারের আগুনের) হাপর লোহা, স্বর্ণ ও রৌপ্যের ময়লা দূর করে। আর কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া কিছুই নয়। (তিরমিজি, হাদিস : ৮১০)
ছয়. কোরবানি করা : জিলহজ মাসের বিশেষ আমল হলো কোরবানি করা। যতটুকু সম্পদ থাকলে জাকাত ওয়াজিব হয় ততটুকু সম্পদের জন্য কুরবানি ওয়াজিব হবে। জিলহজ মাসের দশম দিন থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত কোরবানি করা যাবে। এই সময় হাজিরা মিনা ও আশপাশের প্রাঙ্গণে কোরবানি করেন। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তোমার রবের জন্য নামাজ পড়ো এবং কোরবানি করো।’ (সুরা : কাউসার, আয়াত : ২)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে। (বুখারি, হাদিস : ৬৪৯০)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ওই দিনগুলোতে বেশি বেশি আমল করার তাওফিক দান করুন।
