পাঁচ বছর ধরে চুরি যাওয়া সন্তানকে খুঁজছেন বাবা : মিল পাওয়ায় মামলা, ডিএনএ টেস্ট

সিলেটের সময় ডেস্কঃ

চুরি যাওয়া সদ্যোজাত সন্তানের সন্ধানে পাঁচ বছর ধরে ঘুরে চলেছেন হতভাগ্য এক বাবা। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম, এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলা। যখনই শুনেছেন কোথাও কুড়িয়ে পাওয়া কোনো শিশু বড় হচ্ছে, সেখানেই ছুটে গিয়েছেন সাইফুল। সন্তান হারানোর হাহাকার বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন শিশুটির মা রূপালী বেগম।

দর্জির দোকানে কর্মরত শিশুটির বাবা সাইফুল ইসলাম। তার বাড়ি যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের রূপদিয়া গ্রামে।

সন্তান চুরির পর সাইফুল কোতয়ালি থানায় মামলা করেন। কিন্তু আজও উদ্ধার হয়নি তার সন্তান। তবু হাল ছাড়েননি তিনি। খুঁজে চলেছেন সন্তানকে। সম্প্রতি সন্ধান পাওয়া একটি শিশু সাইফুলের মনে আশার সঞ্চার করেছে। এনিয়ে তিনি গত ৬ অক্টোবর আদালতের শরণাপন্ন হন তিনি। আদালত খোঁজ পাওয়া শিশুটির পরিচয় নিশ্চিত করতে পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন।

এদিকে, শার্শা উপজেলার বাগাডাঙ্গা গ্রামে একটি শিশু প্রতিপালিত হচ্ছে। সেই শিশুটিকে সাইফুল নিজের সন্তান দাবি করে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। শিশুটি যে বাড়িতে প্রতিপালিত হচ্ছে, সেই বাড়ির কর্তা ইউসুফ আলীর বড় ছেলে তুষার ইমরানও শিশুটিকে কুড়িয়ে পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

এ ব্যাপারে কথা হয় সাইফুলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালের ৭ জুলাই যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে অপারেশনের মাধ্যমে তার ছেলের জন্ম হয়। জন্মের একদিন পর অজ্ঞাত পরিচয় এক নারী শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে চুরি করে নিয়ে যায়। চুরি যাওয়া শিশুটির সঙ্গে খোঁজ পাওয়া শিশুটির বয়সের মিল রয়েছে। এছাড়া, আমার ছেলের বাম কানে যেমন দাগ ছিল, এই শিশুটিরও তা আছে। চেহারার সঙ্গেও মিল থাকায় আমার ধারণা, এ শিশুটিই আমার চুরি যাওয়া শিশু। ’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি হাসপাতাল থেকে ছেলে চুরি হলো পাঁচ বছর আগে, অথচ তাকে উদ্ধারে যেন কারো কোনো দায় নেই। গরিব বলে হয়তো আমার সন্তান উদ্ধার হয়নি। ’

সাইফুল জানান, গত ১৯ সেপ্টেম্বর এক প্রতিবেশির মাধ্যমে যশোরের শার্শা উপজেলার বাগাডাঙ্গা গ্রামের ইউসুফ আলীর বাড়িতে কুড়িয়ে পাওয়া একটি শিশু প্রতিপালনের কথা জানতে পারেন। এরপর ২০ সেপ্টেম্বর তিনি ইউসুফ আলীর বাড়িতে যান। ইউসুফ শিশুটি কুড়িয়ে পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে ওই সন্তানকে তাদের জিম্মায় দিতে অস্বীকার করেন। এ ঘটনায় সাইফুল সন্তান ফিরে পেতে ইউসুফ আলীর নামে আদালতে মামলা করেন। মামলার নম্বর ২৬/৬।

শার্শা উপজেলার বাগাডাঙ্গা গ্রামের স্থানীয়রা জানান, শার্শার জামতলা-বালুন্ডা সড়কের কাটাখাল চৌরাস্তা এলাকায় সড়কের পাশে হাফিজুর রহমানের বাড়ির সামনে শিশুটিকে পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে জানতে হাফিজুর রহমানের বাড়িতে গেলে হাফিজুর রহমানের স্ত্রী তহমিনা ও পুত্রবধূ সাথী খাতুন শিশুটিকে সেখানে পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেন। সাথী খাতুন বলেন, ‘তখন রোজার মাস। দ্বিতীয় রোজার জন্য তারাবির নামাজ সবে শেষ করেছি। এ সময় তুষার ও তার ভাই আমাদের ডেকে বাড়ির সামনে শিশুটি পাওয়ার কথা জানায়। তখন আমরা গিয়ে বালি-সুরকির ওপর ওড়নায় জড়ানো শিশুটি দেখতে পাই। তার গায়ে তখন পিঁপড়া ছিল। পরে শিশুটিকে তুষার ও তার ভাই বাড়ি নিয়ে যায়। ’

বাগাডাঙ্গা গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গির আলম, মফিজুর রহমানসহ আরো কয়েকজন শিশুটিকে কুড়িয়ে পাওয়ার বিষয় নিশ্চিত করেন।

শিশুটিকে পাওয়ার দিনের বিষয়ে ইউসুফ আলীর স্ত্রী রূপিয়া বেগম বলেন, ‘যখন শিশুটিকে বাড়ি আনা হয়, তখনও তার নাড়িতে ক্লিপ লাগানো ছিলো। তাতে সহজেই বোঝা যাচ্ছিল, শিশুটি এক দিন বয়সি। এছাড়া, তারা যে চুরি যাওয়া শিশু বলে দাবি করছে, তখনকার সময়ের সঙ্গে এ শিশু পাওয়ার সময়ের বয়স মেলে না। পুলিশ ডিএনএ টেস্টের কথা বলেছে। আমরা টেস্ট করাতে রাজি। তবে আমরা গরিব মানুষ। ঢাকায় যাওয়া-আসার খরচ দেবে কে?’

তিনি আরো বলেন, ‘যে ওড়নায় শিশুটি জড়ানো ছিল, সেটিও আমরা ধুয়ে রেখে দিয়েছি। ’

ইউসুফ আলীর ছেলে তুষার ইমরান (২১) শিশুটিকে কুড়িয়ে পান। শিশুটিকে পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সাল ছিল ২০১৮। সেদিন প্রথম রোজা ছিল। তখন আমি রাজমিস্ত্রীর সঙ্গে কাজ করি। রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় এক ব্যক্তি আমাদের ডাক দিয়ে বলে, রাস্তার পাশে একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ আসছে। সে সময় আমরা এগিয়ে গিয়ে শিশুটিকে একটা ওড়নায় জড়ানো অবস্থায় পাই। তার গায়ে পিঁপড়া ছিল। যেখানে আমরা শিশুটিকে পাই, সেটি কাটাখালি চৌরাস্তা নামে পরিচিত। এরপর শিশুটি নিয়ে আমরা নিকটবর্তী উলাসী ইউনিয়নের সে সময়ের চেয়ারম্যান আয়নাল হকের কাছে যাই। আয়নাল হককে জানিয়ে শিশুটিকে আমার ছোট ভাই হিসেবে বড় করতে থাকি। তার নাম রাখা হয়েছে রেদোয়ান হোসেন শিহাব। এখন সে স্থানীয় ব্র্যাক স্কুলে ছোট ওয়ানে পড়ে। ’

এ বিষয়ে উলাশী ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান আয়নাল হক বলেন, ‘বাগাডাঙ্গা গ্রামটি বাগআঁচড়া ইউনিয়নে। তবে তাদের গ্রামটি আমার বাড়ির নিকটবর্তী হওয়ায় তারা সেদিন শিশুটিকে কুড়িয়ে পাওয়ার বিষয়ে আমাকে জানায়। এ ব্যাপারে বাঁগআচড়া ইউনিয়নের সে সময়ের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কবীর বকুলও জানেন। বিষয়টি আমরা সে সময় শার্শার তৎকালীন ইউএনওকে মৌখিকভাবে জানাই। তিনিও শিশুটিকে তাদের জিম্মায় রাখতে বলেছিলেন। ’

এ ব্যাপারে পিবিআই যশোরের পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন জানান, আদালতের নির্দেশে সাইফুল ইসলামের দাবি যাচাইয়ের জন্য ডিএনএ টেস্টের প্রক্রিয়া চলছে। টেস্ট সম্পন্ন হলে রিপোর্ট আদালতে জমা দেওয়া হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য