বুদ্ধ পূর্ণিমা ও বুদ্ধের শিক্ষা

সিলেটের সময় ডেস্ক ঃ

আজ ১৫ই মে ২০২২ ইংরেজী, ২৫৬৬ বুদ্ধাব্দ, পবিত্র বৈশাখী পূর্ণিমা তিথি। আজ বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের জন্য সর্বশ্রেষ্ট ধর্মীয় উৎসবের দিন।

বিশ্বের সকল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে প্রতিটি পূর্ণিমা আসে বিশ্ব শান্তি, সুখ- সমৃদ্ধি ও আনন্দ ধারার দোলায় দুলে। এসব পূর্ণিমার মধ্য ‘বুদ্ধ পূর্ণিমা’ যার অপর এক নাম “ বৈশাখী পূর্ণিমা” বৌদ্ধদের নিকট খুবই গুরুত্বপূর্ণ , তাৎপর্যবহ এবং পরম আকাংক্ষিত। কারণ, এই পুত পবিত্র পূণ্য তিথিতই সংঘটিত হয়েছিল মহাকারণীক বুদ্ধের জীবনের অবশ্যম্ভাবী মহাঘটনা- রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতমের পৃথিবীতে আগমন, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহাপরিনির্বাণ লাভ। এই তিনটি স্মৃতি ঘিরে রয়েছে বলেই এই পূর্ণিমাকে ত্রি- স্মৃতি বিজড়িত পূর্ণিমাও বলা হয়ে থাকে।

বৌদ্ধ ধর্ম সারা বিশ্বের একটা প্রাচীনতম ধর্ম , ভারতীয় উপমহাদেশের অরাজকতা, হানাহানি, হিংসা অনলের যুগসন্ধিক্ষণে এই ধর্মের আবির্ভাব ঘটে। এরপর আপন মহিমায় বৌদ্ধ ধর্ম সমগ্র উপমহাদেশে তথা সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

অহিংসা ও শান্তি, সকল জীবের প্রতি ভালোবাসা এবং ভোগ-লালসাহীন পবিত্র জীবনাচরণ বৌদ্ধ ধর্মের মূল নীতি। বৌদ্ধ ধর্মে আনুষ্ঠানিক বাড়াবাড়ি নেই তবে জ্ঞানানুশীলন ও শুদ্ধ জীবন চর্চাকে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে।বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্য শ্রেণী বৈষম্য বা উঁচু নিচু ভেদাভেদ নেই। তাই, শত শত বৎসর বৌদ্ধরা দেশে দেশে, দিকে দিকে এত বৌদ্ধ বিহার, সংঘারাম ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছিল। বহু বৎসর ধরে এসব প্রতিষ্ঠান ছিল জনাকীর্ণ। সেখানে ছিলেন অসংখ্য জ্ঞান পিপাসু শিক্ষার্থী, ভিক্ষু সংঘ, গবেষক , পন্ডিত ও সাধুসঙ্গ প্রত্যাশীগণ।বাংলাদেশের বিক্রমপুর, ময়নামতি, মহাস্থানগড় ও পাহাড়পুরের পুরাকীর্তি, ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাকীর্তি আজও এই ঐতিহ্যের নিদর্শন বহন করে চলেছে।

গৌতম বুদ্ধ যে বাণী প্রচার করেছেন সেগুলিকেই তাঁর ধর্মের মূলমন্ত্র বলা যায়। এর মধ্যে কোন অলৌকিকতা নেই। বরং এগুলোকে যে কোন সৎ মানুষের জন্য জীবনাচরণের দিক নির্দেশনা বলা যেতে পারে।মহাজ্ঞানী বুদ্ধের মতে , মানুষ তার নিজ কর্মফলে বারবার জন্মগ্রহণ করে করে। কর্মফল শেষ না হলে জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মানুষের মুক্তি নেই। জন্ম মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তিকেই তিনি বলেছেন নির্বাণ বা শান্তি। জন্ম ও মৃত্যুর জন্যই মানুষকে এত দুঃখ কষ্ঠ ভোগ করতে হয়।জন্ম ও মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি লাভ করতে পারলেই মানুষের চির শান্তি বা নির্বাণ লাভ হয়। নির্বাণের মধ্য দিয়ে মানুষের সকল দুঃখের অবসান ঘটে। এই নির্বাণতত্বই বৌদ্ধ ধর্মের মূল সত্য।

ধর্মীয় ব্যাপারে গৌতম বুদ্ধ ছিলেন মধ্যপন্থার অনুাসারী। এই মধ্যপথ হিসেবে তিনি চতুরার্য সত্য তথা ক) দুঃখ, খ) দুঃখের কারণ, গ্) দুঃখ দূরীকরণ এবং ঘ) দুঃখ রোধ করার উপায় এবং আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ তথা ক) সম্যক দৃষ্টি, খ) সম্যক সংকল্প , গ) সম্যক বাক্য, ঘ) সম্যক কর্ম,ঙ) সম্যক জীবিকা, চ) সম্যক স্মৃতি, ছ) সম্যক প্রচেষ্ঠা এবং জ) সম্যক সমাধি প্রভৃতি মার্গ বা পথের নির্দেশ দিয়েছেন। এই মার্গে কোন কঠিন তত্ব বা ধর্ম সাধনার ইঙ্গিত নেই। বরং যে কোন সৎ ও সত্য সন্ধানীর জন্য এগুলি হতে পারে মানব প্রেম ও মানবীয় জ্ঞানের গভীরতা উপলব্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। মহামতি বুদ্ধ মানুষকে মনুষ্যত্বের মর্যাদায় অধিষ্টিত করতে চেয়েছেন এবং মানুষকে তিনি মর্যাদা লাভের উপায়ও বাতলে দিয়েছেন। মানুষ নিজের চেষ্টা ও কর্মের দ্বারাই মর্যাদা লাভ করতে পারে আর এর মাঝেই রয়েছে মানুষের মুক্তির পথ।

বর্তমান বিশ্বের রাষ্ট্রীয় ও সমাজ ব্যবস্থায় বস্ত্তগত ভাব প্রবণতার ফলে জীবন যাত্রা অগ্রসর হচ্ছে চরম জটিলতার দিকে।পুরো পৃথিবীজুরে আজ মানুষের প্রতি মানুষের সন্দেহ, বিশ্ব মহামারী, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আতংক, আক্রোশ,সীমাহীন হিংসা- বিদ্বেষ, স্বার্থপরতা, ভুল বুঝাবুঝি, প্রবন্চনা, শঠতা ও হননে বিশ্ব পরিবেশ হয়েছে দূষিত। পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় , জাতিগত, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিরোধ- বৈষম্য সর্বত্র বিরাজমান, এর প্রেক্ষিতে অসংখ্য নিরীহ ও শান্তিকামী মানুষ তাদের বেঁচে থাকার জন্মগত অধিকার থেকে হচ্ছে বন্চিত কিংবা মানবেতর জীবন যাপন করছে। বর্তমান যুদ্ধবিগ্রহ, পারমানবিক অস্ত্র পরীক্ষা ও প্রতিযোগিতা চরমভাবে বিশ্ব শান্তি বিঘ্নিত করছে। মহাকারণীক গৌতম বুদ্ধের শাশ্বত মৈত্রীপূর্ণ শিক্ষার আলোকে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে।বুদ্ধের মতে সকল অশান্তি ও উত্তেজনার জনক আত্মকেন্দ্রিকতা বা লোভ, দ্বেষ ও মোহ।এগুলো সৃষ্টি করে স্বার্থপরতা ও পক্ষপাতিত্ব, যা রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে পর্যন্ত অবতীর্ণ করিয়ে দুর্লভ মানব জীবনের ধ্বংস ঘটায়। গৌতম বুদ্ধের উপদেশ মতে মৈত্রীর অনুশীলনের মাধ্যমে সদিচ্ছা, সহাবস্থান , সহমর্মিতা, সৌভাতৃত্ববোধ ও পরস্পরের বক্তব্য সন্মানের সাথে উপলব্ধির করার মধ্য দিয়ে উক্ত সমস্যার মীমাংসা বা সমাধান করা যায়।

তথাগত বুদ্ধ তাঁর সুদীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে ধর্মপ্রচারকালে অজস্র উপদেশ ও বাণী প্রদান করেন। সেসব উপদেশ ও বাণী আজকের বিক্ষুব্ধ এবং হিংসোন্মত্ত বিশ্বে শান্তির অমিয় সুধা প্রস্রবিত করার জন্য অপরিহার্য । যেমন- মৈত্রীর দ্বারা ক্রোধ, সাধুতার দ্বারা অসাধু, ত্যাগের দ্বারা কৃপণতা, সত্যের দ্বারা মিথ্যা , মিত্রতার দ্বারা শত্রুতাকে পরাভুত করা, সর্বপ্রকার পাপ থেকে বিরতি, কুশল কর্ম ও স্বীয় চিত্তের পবিত্রতা সাধনই বুদ্ধের অনুশাসন।

সবশেষে আজ এই পবিত্র বুদ্ধ পূর্ণিমা তিথীতে সকলকে জানাচ্ছি মৈত্রীময় শুভেচ্ছা । সব্বে সত্ত্বা সুখিতা হোন্তু দুঃখা পমুচ্চান্তু। জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক, সকলে দুঃখ মুক্তি হউক। জয়তু বুদ্ধ সাসনম।

লেখক- সীবলী বড়ুয়া, সভাপতি, “ ইন্টারন্যাশনাল বুডিডস্ট কাউন্সিল অব ফ্রান্স” ও “ ফ্রান্স আন্তর্জাতিক শিল্পকলা এসোসিয়েশন “

এ বিভাগের অন্যান্য