ঈদের আনন্দ নেই সুন্দরগঞ্জের চর গ্রামগুলোতে

সিলেটের সময় ডেস্ক ঃ

তিস্তাপারে শিশু-কিশোরদের উল্লাসভরা কণ্ঠে ‘আস্লামু আলাইকুম, ঈদ মুবারক’ শুনে মনে হলো নদীভাঙনে লণ্ডভণ্ড গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চর ইউনিয়ন কাপাসিয়ার বাতাসও জানান দিচ্ছে আগামীকাল ঈদ। খুশির বার্তা ছড়ানো চারদিকে। বালিতে পা ঢুকিয়ে গুহা বানান খেলছিল হাজেরা (১০)। বলল, হামার আব্বো ঢাকাত ইকসা (রিকশা) চল্যায়।

রাতোত আস্যি যাবে মনে হয়। তখন আঙ্গা (কাপড়) কিনমো, ঈদের দিন গোস্ত পোলাও খ্যায়া সারদিনে হুড়াহুড়ি খেলমো।

তবে একটু দূরে বাঁশের গাঁট কাটছিলেন রহিম মিয়া (৫৫)। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বললেন, নাই বাহে, খুশি নাই। ছোলপোল বুঝে না। আক্কুসি তিস্তা জমি খাচে, ঘর খাচে, গাচগাছালি সগ্যে খাচে। তারপর গেল তোমার করোনা। হাত এক্কেবারে খালি। কি দিয়্যা ঈদ করমো?

এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কাপাসিয়ার ৯টি ওয়ার্ডের আটটিই ভাঙনের কবলে। ভিটেমাটি জমিজমা হারানো মানুষগুলো তিস্তার ছোবল থেকে বাঁচতে ক্রমাগত পিছিয়ে যেতে যেতে এখন কোণঠাসা। সব হারিয়ে নিঃস্ব মানুষের জীবনে সামান্য খুশির উপলক্ষ পর্যন্ত নেই। করোনা পরবর্তী কর্মহীন সময়ে কেউ কেউ পড়েছেন সুদের ফাঁদে। এ রকম একটা সময়ে দুয়ারে ঈদ। অবুঝ শিশুদের খুশির ঈদের উল্লাস শুনে অভাবি মানুষগুলোর কপালের ভাঁজ চওড়া হচ্ছে।

তিস্তা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়েই প্রান্তিক কৃষি শ্রমিক আনারুল মিয়া (৫৫) বললেন, শহরের সুখী মানুষ্যেরা রমজান থাকিয়্যাই ঈদের ভাবনা শুরু কচ্চে। আর হামার হচ্যে উল্টা। কোনোমতে রোজার নিয়ত পূরণ করচ্যি। ঈদ কাল। হাত খালি। ছোলগুল্যার একবেলা ভালো খাওয়্যার সখও পুর‌্যা কর‌্যার তাগদ নাই। নতুন কাপড়া তো দূরের কথা। কি কপাল বাহে!

ওই ইউনিয়নের পুঁটিমারী আর ভাটি কাপাসিয়া গ্রাম। এক সময়ে এই গ্রাম দুটোর হতশ্রী দশা ছিল না। নাম আলাদা হলেও ভাঙনের কারণে এই দুই গ্রামের দূরত্ব কমে প্রায় এক হয়ে গেছে। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের সংখ্যা বেশি। ঈদের আগের দিন তাদের পরিস্থিতি জানতে গিয়ে দেখা হলো মাজেদা বেগমের (৩২) সাথে। ভাঙনে দুই দফা সব হারিয়ে এই দুই গ্রামের মাঝখানে অন্যের জায়গায় টিনের ঘর তুলেছেন তিনি ও স্বামী শাহজামাল (৩৯)। তাদের ৯ ছেলে মেয়ে। করোনায় দীর্ঘ কর্মহীন থাকার পর মাস তিনেক আগে পরিবারের অন্ন সংস্থান করতে ঢাকায় একটি ইঁটখোলায় কাজ করতে গেছেন শাহজামাল। আজ তার বাড়ি ফেরার কথা।

শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়ে শাহেনা (২৭) আর অন্য ছেলে-মেয়েদের নিয়ে মাজেদা মহাসংকটে। স্বামী কখনও সামান্য টাকা পাঠান, কখনও পাঠাতে পারেন না। ঈদের কথা শুনে তার বুক ভেঙে আসা দীর্ঘশ্বাস স্পষ্ট টের পাওয়া যায়। মাজেদা বললেন, ‘ওই মানুষট্যার দোষ দিয়্যা লাভ নাই। ঢাকাত কাজ করিয়্যা যা পায় তা দিয়্যা নিজের চল্যা নাগে, ফির বড়িতো কয়েক শ পাঠ্যায়।   বাচ্চারা তাকে আচে ওমার বাপ্যো আসার পথের দিকে চ্যায়া। ’ এত কষ্টের মধ্যেও তার মুখে হাসির আভা। ‘বাজারত গেলে দাম শুনিয়্যা ধুঁইসুঁই অবস্থা। তোমর‌্যা বা ওমার খুশির পালোত হাওয়া দেন ভাইাজান!’

তবে শিশু সন্তানরা অতশত বোঝে না। তারা ঈদের খুশিতে আঙিনায় দল বেঁধে খেলায় ব্যস্ত। শাহেনা, রাজিয়া, শাহানা, ফারজানা একটু দূরে থাকলেও মাসুদ আর মানিক দৌঁড়ে এসে জানাল, আব্বো অ্যালে সেমাই খামো, নামাজ পড়িয়্যা গোস আর পোলাও হবে। লাল জামা কিনিয়্যা নেমোই নেমো।

ভালো নেই ওই গ্রাম দুটোর বাকি তিন শ পরিবারের বেশির ভাগ। হতদরিদ্র এ সব পরিবারের সমর্থ পুরুষরা ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় রিকশা টানেন, ইট ভাঙেন, কৃষি শ্রমিকের কাজ করেন। এলাকায় যারা থাকেন তারা কৃষিক্ষেত্র ছাড়াও দিনমজুরি করে সংসার চালান। নারীরাও আশপাশের এলাকায় কাজকর্ম করেন। প্রতিদিন যা আয় করেন তা দিয়ে প্রতিদিনের খরচই চালানো মুশকিল। ঈদের কথায় তাদের কণ্ঠে কখনও দুঃখের সুর, কখনও ক্ষুব্ধতা। সবার কথা, সরকারি সাহায্য যা আসে বেশির ভাগ তো পায় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দিনমজুর বললেন, হামার ন্যাকান মানুষ কামল্যা দিয়্যা দিনে পায় সাড়ে তিন শ থেকে চার শ। সবদিন ফির কামও নাই। সবার ঘরে খানেওয়ালা কম করিয়্যা দশ। এখন বোঝেন, ঈদত কি হোবে!

কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মঞ্জু মিয়া বললেন, কাপাসিয়ার এইসব হতদরিদ্র মানুষ একসময় ফসলি জমি, নিজের বসতভিটায় স্বচ্ছল দিন কাটাতেন। সময়ের সাথে সাথে আগ্রাসী তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে তারা এখন পথের মানুষ। এই ইউনিয়নে প্রায় ১২ হাজার মানুষ বাস করেন। কাপাসিয়া  ইউনিয়নের ৯০ ভাগ মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে। এবার ঈদের জন্য ২৯০০ ভিজিএফ কার্ড বিলি করা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন চাহিদার তুলনায় তা অনেক কম।

শুধু কাপাসিয়া নয়, ওই উপজেলার বেলকা, তারাপুর, রামজীবন, শ্রীপুর, হরিপুর ইউনিয়ের চর গ্রামের অসংখ্য মানুষের ঘরে এবার ঈদের আনন্দ ফিঁকে হয়ে যাবে।

এ বিভাগের অন্যান্য