ঘরে ঘরে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী

সিলেটের সময় ডেস্ক ঃ

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, শ্যামপুর ও কদমতলী এলাকার প্রায় ঘরে ঘরে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী। এলাকাবাসী ও তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বলছেন, ওয়াসার দুর্গন্ধযুক্ত দূষিত পানির জন্যই তাঁদের এই অবস্থা। এলাকার বেশির ভাগ মানুষই দরিদ্র শ্রেণির। তাদের বেশির ভাগই ওই পানি পান না করলেও হাঁড়ি-পাতিল ধোয়ার জন্য ব্যবহার করে।

তবে অনেকের পক্ষে পানি ফুটিয়ে পান করাও সম্ভব হয় না।

মীরহাজীরবাগ এলাকার আবদুল মাজেদ পেশায় ভ্যানচালক। যাত্রাবাড়ীতে মাছের আড়তে কাজ করেন। ১৩ বছর বয়সী ডায়রিয়া আক্রান্ত মেয়ে সাবিনাকে নিয়ে তিন দিন মহাখালীর আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআরবি) হাসপাতালে ছিলেন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে বাসায় ফেরার এক ঘণ্টা পর কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি জানালেন, বাসায় ফিরে দেখেন, স্ত্রী সালেহা বেগম ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়েছেন। মাজেদের দুই বাসা পরের একটি বাসায় থাকেন ক্ষুদ্র দোকানি লেবু মিয়া। গতকাল সকালে তিনি ডায়রিয়া আক্রান্ত স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে যান। বাসায়  রেখে যান তাঁদের ছোট দুই শিশুসন্তানকে।

এলাকায় ডায়রিয়া ছড়িয়া পড়ার কথা স্বীকার করে একাধিক কাউন্সিলর এ জন্য দায়ী করেন তাঁদের এলাকার কিছু অংশে ওয়াসার পান-অযোগ্য, দুর্গন্ধযুক্ত পানিকে। এলাকাবাসীরও একই অভিযোগ। তারা বলে, ওয়াসার দুর্গন্ধ পানি পান করার বদলে রান্নার কাজে ব্যবহার করে বেশি। এলাকায় ঘুরে জানা যায়, ওয়াসার মূল লাইন থেকে নেওয়া পার্শ্ব লাইনের পানি গ্রহণকারীরাই বেশি মাত্রায় আক্রান্ত হয়েছে।

যাত্রাবাড়ীর মীরহাজীরবাগ থেকে যে সড়কটি জুরাইন পর্যন্ত গেছে ওই সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই লাখ লোকের বসবাস। এরা সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ এবং বাড়ির মালিকরা ওয়াসার মূল লাইন থেকে পার্শ্ব লাইন নিয়ে এদের পানি সরবরাহ করে আসছেন। ওই সড়কের বাসিন্দা শামসুল ইসলাম বলেন, ‘ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আমাদের এলাকায় বেশি। ওয়াসার পানি মুখে দেওয়া যায় না, পানি কিনে বা দূরের কোনো টিউবওয়েল থেকে পানি সংগ্রহ করে খেতে হয়। তবে থালাবাটি পরিষ্কার করা ও রান্নার কাজে বাধ্য হয়ে ওয়াসার দুর্গন্ধযুক্ত পানিই ব্যবহার করতে হয়। বাড়িওয়ালা বা বিত্তবানদের মতো পানি ফুটিয়ে খাওয়ার সাধ্য এবং সময় আমাদের নেই। ’

যাত্রাবাড়ী থানার মধ্য যাত্রাবাড়ী, পশ্চিম যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, ধলপুর, মীরহাজীরবাগ এলাকা, কদমতলী ও শ্যামপুর থানার সীমান্ত এলাকা  জুরাইন, কমিশনার রোড, খন্দকার রোড, মুরাদপুর, কবরস্থান রোড, মুরাদপুর মাদরাসা রোড ও মেডিক্যাল রোড এলাকা, শনির আখড়ার গোবিন্দপুর বাজার, শেখদি স্কুল রোড ও ধনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সড়ক এলাকায় ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। আইসিডিডিআরবি হাসপাতাল থেকেও একই তথ্য মিলেছে।

শনির আখড়ার গোবিন্দপুর বাজার এলাকার ট্রাক শ্রমিক আবদুল মালেক বলেন, ‘আমার দুই ছেলেরই ডায়রিয়া হইছিল, মুগদা জেনারেল হাসপাতালে চিকিত্সা নেওয়ার পর সুস্থ হইছে। গত বৃহস্পতিবার আক্রান্ত হয় আমার বোনের মেয়ে সাবিনা (২০)। তাকে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিত্সকরা মহাখালীর আইসিডিডিআরবি  হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। ’

একই এলাকার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু এবার নয়, প্রতিবছর গরমের সময়ে আমাদের এলাকায় ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দেয়। এখানের ওয়াসার পানিতে ময়লা, দুর্গন্ধ—এ নিয়ে আমরা বারবার ওয়াসার কাছে গিয়েছি, কোনো লাভ হয় নাই। ’

পূর্ব যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জের কুতুবখালী পর্যন্ত এলাকায় এবার ডায়রিয়া আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। এলাকাটিতে নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা বেশি। এলাকার বাসিন্দা নুর আলম বলেন, তাঁর স্ত্রী, কন্যাসহ পরিবারের চারজনই ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়েছিল। মহাখালীর আইসিডিডিআরবি হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছে সবাই। এখন সুস্থ। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের আশপাশের বাড়ির আরো ৯ জন ডায়ারিয়া আক্রান্ত রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। ’

ওই এলাকার ছদরুল আমিন বলেন, ওয়াসার পানি ব্যবহার করার কারণেই এলাকায় ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বেশি।

এলাকায় ব্যাপকভাবে ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের যাত্রাবাড়ী এলাকার ৫০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাসুম মোল্লা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি জানি, এলাকায় ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে, এ জন্য দায়ী ওয়াসার পানি। ডায়রিয়া পানিবাহিত রোগ এটা সবার জানা। আমাদের এলাকায় ওয়াসার পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধ। এ পানি মুখে দেওয়া যায় না। এ নিয়ে আমি অনেকবার ওয়াসা কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েছি। তারা কোনো পাত্তা দেয় না। ’

একই অভিযোগ ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কালাম অনুর। তিনি বলেন, ওয়াসার পানির কারণেই লোকজন ডায়রিয়া আক্রান্ত হচ্ছে। সব মানুষের পানি ফুটিয়ে পান করার সামর্থ্য নেই। নিম্ন আয়ের মানুষজন সরাসরি ওয়াসার পানি পান করে এবং তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।

ওয়াসাসংশ্লিষ্ট মডস জোন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আল আমীন এসব অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, ‘ওয়াসার পানি খেয়ে অসুস্থ হয়েছে—এ ধরনের কোনো লিখিত অভিযোগ আমরা পাইনি। ’

 

এ বিভাগের অন্যান্য