পাঁচ বছরেও হাতে পৌঁছেনি প্রধানমন্ত্রীর অনুদানের চেক

সিলেটের সময় ডেস্ক ঃ

ছোট্ট একটি দা হাতে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন নিয়ে ফিরে এসেছেন ইমান আলী গাজী (৬৫)। কিন্তু বাঘের হামলায় হারাতে হয়েছে বাম হাত। এ ছাড়া বাম চোখসহ ঘাড়-পিঠ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে তার। অসম সেই যুদ্ধে বাঘকে হারাতে পারলেও পঙ্গুত্বের কারণে জীবনযুদ্ধে চরমভাবে পরাজিত হয়েছেন ইমান আলী।

অভাবের তাড়নায় মানুষের কাছে হাত পেতে জীবন চালাতে হচ্ছে তাকে। তবে ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়ানোর আগে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে সাহায্যের আবেদন করেছিলেন ইমান আলী। এরপর ২০১৮ সালের মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সাহায্য বরাদ্দের চিঠি পান তিনি। এতে আনন্দের বন্যা বইয়ে যায় ইমান আলীর মনে।

স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সাহায্যের টাকা তুলে ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবন চালানোর। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে। চিঠি যাওয়ার ৫ বছর পরও বরাদ্দের টাকার চেকটি হাতে পাননি তিনি।

ইমান আলী গাজী সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার যতীন্দ্রনগর ইউনিয়নের বড় ভেটখালী হরিনগর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের মৃত জিয়াদ আলী গাজীর ছেলে। বর্তমানে রাজধানীর কলেজগেট এলাকায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে ভিক্ষা করে জীবন কাটান তিনি। সম্প্রতি সেখানেই দেখা ও কথা হয় ইমান আলীর সঙ্গে।

মানুষের কাছে হাত পাততে পাততে ইমান আলী বলেন, সুন্দরবনে ঘুরে মধু সংগ্রহ করে যা আয় করতাম তা দিয়ে পরিবার নিয়ে ভালোই দিন কাটছিল। কিন্তু ২০০৭ জীবনে ঘটে সেই দুর্বিষহ ঘটনা। বড় ছেলে রাশিদুল, ভাগ্নে রহিম ও ছোটভাই শুকুর আলীকে নিয়ে গহীন সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম। অন্যরা মৌচাকের সন্ধানে নৌকা থেকে নেমে বনে চলে গেলে আমি তাদের রান্নার জন্য থেকে যাই। এরপর নৌকায় থাকা ছোট্ট চুলায় ভাত তুলে দিয়ে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্দেশে নৌকা থেকে নামি। পরে খালের পাশ থেকে গাছের শুকনো ডাল-পাতা সংগ্রহ করে নৌকায় ফেরার পথে পেছন থেকে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। মুহূর্তেই পিঠ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। এ সময় জীবন বাঁচাতে হাতে থাকা দা নিয়ে বাঘের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করি। কিছুক্ষণ পর বাম হাতে কামড় বসিয়ে আমাকে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করে বাঘটি। এ সময় ঘাবড়ে না গিয়ে ডান হাতে থাকা দা দিয়ে বাঘের মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকি। এক পর্যায়ে বাঘটি আমাকে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে ছেলে-ভাইয়েরা গুরুতর আহতাবস্থায় উদ্ধার করে। সেখান থেকে আমাকে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাৎক্ষণিক সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে সেখানকার চিকিৎসকরা আমার বাম হাত কবজির নিচ থেকে কেটে ফেলার পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, হাত থাকতেই কাজ করে জীবন চালাতে পারি না, তাই হাত কাটলে কী হবে? সেই চিন্তায় হাত না কেটে খুলনার আড়াই শ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে চলে যাই। সেখানকার চিকিৎসকরা অনেক চেষ্টা করেছেন হাতটি বাঁচানোর। কিন্তু এক পর্যায়ে ইনফেকশন হয়ে গেলে হাতটি কেটে ফেলতে বাধ্য হই। এরপরই আমার জীবনের দুঃখের দিন শুরু।

ইমান আলী জানান, বাঘের হামলায় আহত হওয়ার পর শুরুতেই কারো কাছে হাত পাতেননি তিনি। পরে বন্যপশুর আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে আর্থিক সাহায্য পেতে আবেদন করেছিলেন ইউএনও অফিস, ডিসি অফিসসহ বিভিন্ন স্থানে। কিন্তু কোথাও সারা মেলেনি। সবশেষে স্থানীয় সংসদ সদস্য এসএম জগলুল হায়দারের সুপারিশসহ তিনি প্রধানমন্ত্রী বরাবর সাহায্যের আবেদন করেন। সেই আবেদনে তার নামে ৩০ হাজার টাকার সাহায্য বরাদ্দ হলেও চেক হাতে পাননি।

ইমান আলী বলেন, চিঠিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে আমাকে চেকটি বুঝে নিতে বলা হয়েছে। সেই অনুযায়ী বারবার শ্যমনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সাতক্ষীরার ডিসি অফিসে গেছি। কিন্তু আমার নামে বরাদ্দকৃত চেকটির সন্ধান কেউ আমাকে দিতে পারেনি। এখন টাকার অভাবে চিকিৎসাও করাতে পারছি না আমি।

ইমান আলীর ছেলে রাশিদুল জানান, শুধু বাবা নয়, তার পরিবারের আরো ৩ সদস্য বাঘের হামলার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২ জন প্রাণও হারিয়েছেন। কিন্তু কেউই সরকারি কোনো সাহায্য পাননি। তার আপর ফুপু নাসিমা বাঘের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরে স্বামী খলিলের সঙ্গে বাড়ি ফেরার পথে পেছন থেকে নাসিমার ঘাড়ে কামড় দিয়েছিল বাঘ। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। তার আরেক ফুফু রাবেয়া খাতুনের স্বামী রহমানও বাঘের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। মধু সংগ্রহ করতে সুন্দরবনে ঢুকে বাঘের হামলার মুখে পড়েন রহমান। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি।

এ ছাড়াও ইমান আলীর আপন মামা রুহুল আমীন গাজী বাঘের হামলায় আহত হয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালের এক রাতে নদী সাঁতরে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছিল একটি বাঘ। সেটিকে ধরতে একসঙ্গে হামলা চালিয়েছিল এলাকাবাসী। সেসময় আচমকা বাঘের হামলায় আহত হন রুহুল আমীন। পরে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন তিনি।

যতীন্দ্রনগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কাশেম জানান, পরিবারটির কয়েকজন বাঘের হামলার শিকার। কিন্তু কেউ কোনো অর্থ সাহায্য পাননি। অর্থাভাবে এই বৃদ্ধ বয়সেও ইমান আলী ভিক্ষা করে জীবন চালাচ্ছে। তাদের জন্য সরকারের কিছু করা উচিত।

এদিকে ইমান আলীর চেকের বিষয়ে জানতে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আক্তার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি গত জানুয়ারি মাসে এখানে এসেছি। তাই এ বিষয়ে কিছু জানা নেই আমার।

সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, ইমান আলীর নামে এমরকম কোনো চেক সাতক্ষীরা জেলা পরিষদে আসেনি।

সাতক্ষীরা-৪ আসনের (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ আংশিক) সংসদ সদস্য এস এম জগলুল হায়দার বলেন, বিষয়টি দুঃখজনক। চেকটি কোথায় মিসিং হলো বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।

জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন- প্রধানমন্ত্রীর তহবিল) মো. মকবুল হোসেন বলেন, ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে দেখলাম ইমান আলীর ওই চেকটি এখনো ডেবিড হয়নি। অর্থাৎ চেকটি হয়তো সংশ্লিষ্ট ডিসি অফিস প্রাপকের কাছে হস্তান্তর করেনি। তাছাড়া চেকটি কোথাও না কোথাও মিসিং হতে পারে। এখন প্রাপক আবারও সহায়তা বরাদ্দের সেই চিঠি, চেক নাম্বার ও জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবিসহ প্রধানমন্ত্রীর অ্যাসাইন্টমেন্ট অফিসারের কাছে আবেদন করতে পারেন। তাহলে বরাদ্দকৃত ওই অর্থের বিপরীতে তিনি আবারও চেকটি পেতে পারেন।

 

এ বিভাগের অন্যান্য