মাদক কারবারিরা নিজেরাও চান না সন্তান অন্ধকার পথে আসুক

 

সীমান্তপথে মাদক আসাটা যেন ‘ওপেন সিক্রেট’। আগে বেশি আসতো মদ, গাঁজা ও ফেন্সিডিল। এখন বেড়েছে ইয়াবা কারবার। তবে থেমে নেই গাঁজা পাচার কিংবা ফেন্সিডিলের বিকল্প মাদক আসা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্তেও এর ব্যতিক্রম নয়।

জেলা পুলিশ ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে মাদক পাচাররোধে কাজ করতে শুরু করেছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করে পুলিশ। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা বিশেষ অভিযানে কিছু সফলতাও এসেছে।

এরই ধারাবাহিকতায় জেলার আখাউড়া থানা পুলিশ কয়েকজন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে মাদক ব্যবসা ও এর নেপথ্যের অনেক কাহিনী জেনেছে পুলিশ। দুই মাদক কারবারির আলোচনায় উঠে এসেছে, তারাও চান না সন্তানেরা এ পথে আসুক। সন্তানরা এ পথ থেকে ফেরার জন্য অনুরোধও করে বলে জানান তারা।

আখাউড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মিজানুর রহমান মঙ্গলবার দুপুরে বলেন, ‘মাদক কারবারিদের ধরার পর চেষ্টা করছি নেপথ্য কাহিনী জানতে। কীভাবে তারা মাদক কিনে আনে, কোথায় বিক্রি করে, কারা কারা জড়িত এসব জানার চেষ্টা চলে। এছাড়া তাদের পারিবারিক অনেক বিষয়েও জানা হচ্ছে।

শাহবুদ্দিন চান না সন্তান মাদকে জড়াক
হঠাৎ করেই আবেগপ্রবণ হয়ে গেলেন মাদকসহ ধরা পড়া শাহবুদ্দিন। কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। চোখ গড়িয়ে পানি বেরুলো। বললেন, ‘না, আমি চাই না আমার সন্তানের হাতে মাদক উঠুক। ’ বিক্রির জন্য শাহবুদ্দিনের বহন করা মাদক তো তার সন্তানের হাতেও যেতে পারে- পুলিশের এমন প্রশ্নে শাহবুদ্দিন জানান এ কারবারে জড়িয়ে পড়াটা ছিলো তার ভুল সিদ্ধান্ত।

মো. শাহবুদ্দিন সৌদি আরবে কাটিয়েছেন প্রায় ১০ বছর। বছর কয়েক আগে দেশে ফেরার পর করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রবাসে যাওয়া হয়নি। ভালো আয়ের পথ হিসেবে বেছে নেন মাদক কারবার। এক বন্ধুর মাধ্যমেই তার এ পথে আসা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের খারকুট গ্রামের মো. মোতালেব সরকারের ছেলে মো. শাহাবুদ্দিন সরকার (৩৬)। রবিবার বিকেলে ১০ কেজি গাঁজাসহ ধরা পড়েছেন পুলিশের হাতে।

শাহবুদ্দিন যে সিএনজিচালিত অটোরিকশা দিয়ে গাঁজা বহন করছিলেন, এর চালক উপজেলার মোগড়া উত্তর পাড়ার আলতাফ ভূঁইয়ার ছেলে জালাল ভূঁইয়াকেও (৩৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এসআই এরশাদ মিয়া ও এএসআই আলমগীর হোসেন এ অভিযান পরিচালনা করেন।

এদিকে, পৃথক এক অভিযানে আখাউড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের হীরাপুর গ্রামের হেবজু মিয়ার ছেলে মো. আল-আমিনকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এসআই ময়নাল হোসেনের নেতৃত্বে গ্রেপ্তার হওয়া আল-আমিন দুটি মাদক মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি বেশিরভাগ সময় সীমান্তের শূন্য রেখায় অবস্থান করতেন।

পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া ৩ জনই পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মাদক কারবারের ফিরিস্তি তুলে ধরেন। শাহবুদ্দিনের কাছ থেকে তার এ কাজে জড়িয়ে পড়াসহ বিভিন্ন বিষয় জানতে পেরেছে পুলিশ। শহাবুদ্দিন বেশ কয়েকজন চিহ্নিত মাদক কারবারির নামও বলেছেন। সীমান্ত দিয়ে মাদক আসার বিষয়ে পুলিশকে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন আল-আমিন। মামলা দায়ের করে তাদেরকে সোমবার সকালে আদালতে পাঠানো হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৮ সালে সৌদি আরবে পাড়ি জমান মো. শাহবুদ্দিন। উদ্দেশ্য সংসারের অভাব ঘোচানো। কায়িকশ্রমের আয়ে ধীরে ধীরে পরিবারের আর্থিক অভাব সামলে নেন। ২০১৬ সালে বিয়ে করে যৌথ পরিবার থেকে আলাদা হলে নতুন সংসারজীবন শুরু হয় শাহবুদ্দিনের। ২০১৭ সালের শুরুর দিকে  এক পুত্র সন্তানের জনক হন। করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে দেশে ফিরে আসেন। এরপর আর প্রবাসে যাওয়া হয়নি। শুরু হয় বেঁচে থাকার নতুন সংগ্রাম।

শাহবুদ্দিন পুলিশকে জানান, মাদক কারবারি বন্ধুর শলাপরামর্শে শুরু করেন এ কাজ। বেশি লাভের আশায় এ পথে তার আসা। বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। একমাত্র সন্তানকে সম্প্রতি স্থানীয় কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করিয়েছেন। তবে তিনি চান না তার সন্তান কোনো দিন মাদক ছুঁয়ে দেখুক।

রমজানের ছয় বছরের সন্তানের অনুরোধ
মাদকসেবী হিসেবে এ পথে পা বাড়ান রমজান। রাজমিস্ত্রীর কাজ থেকে আসা আয় দিয়ে প্রতিদিনই মাদক সেবন করতেন। ইস্কপ নামে মাদকের দাম বেশি হওয়ায় এক বন্ধুসহ দুজনে মিলে একটা সেবন করতেন। একপর্যায়ে মাদক কারবারি হয়ে ওঠেন রমজান মিয়া। আয় বাড়ে বহুগুণ। বেড়ে যায় মাদক সেবনের মাত্রাও।

আখাউড়া পৌর এলাকার দুর্গাপুরের ফিরোজ মিয়ার ছেলে রমজান মিয়ার নামে চারটি মাদকের মামলা। সম্প্রতি এক সন্তানের জন্ম হয়েছে তার। আগের আরো দুই সন্তান। স্বাচ্ছন্দে সংসার চালাতে মাদক কারবারে ঝুঁকে থাকেন।

সোমবার রাতে উপজেলার আমোদাবাদ এলাকা থেকে ১০ বোতল ফেন্সিডিলসহ গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাছে অনেক বিষয় তুলে ধরেন রমজান। জানান, ছয় বছরের ছেলে সন্তান প্রায়ই বলে এ পথ পরিহার করতে। নয়তো তাদেরকে ‘ব্ল্যাকারের (চোরাকারবারি)’ সন্তান হিসেবে পরিচয় বড় হতে হবে। বিয়ে-শাদিসহ পারিবারিকভাবে তাদেরকে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।

পুলিশের সঙ্গে আলাপকালে রমজান আরো জানান, রাজমিস্ত্রী হিসেবে কাজ করে তার আয় হতো প্রতিদিন পাঁচশ’ টাকা। এ আয়ে পোষাতো না। যে কারণে মাদক কারবারে পা বাড়ান। একেকবার মাদক বহন করলে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার মতো আসে। এভাবে মাসে আয় হতো ৫০-৬০ হাজার টাকা।

রমজান আরো বলেন, এ পথে লাভ নেই খুব একটা। চারটি মামলা চালাতে গিয়ে লাখ দেড়েক টাকার মতো খরচ হয়েছে। এছাড়া নানাভাবে পুলিশি হয়রানি শিকার হতে হয়েছে। সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হতে হয়। কিন্তু নানা কারণে এ পেশা থেকে সরে আসতে পারেন না। একবার পেশা ছাড়ার পরও পুলিশের হয়রানির শিকার হতে হয়। এরপর আবার এ পথে পা বাড়ান।

এ বিভাগের অন্যান্য