লিবিয়া থেকে ফিরলেন ১১৪ বাংলাদেশি, মুক্তি পাওয়ার সময় ফের জিম্মি ৬

সিলেটের সময় ডেস্ক ঃ

অবৈধ উপায়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টাকালে লিবিয়ায় আটক ১১৪ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৮টায় বুরাক এয়ারের ভাড়া করা একটি ফ্লাইটে তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)।

তবে এই বাংলাদেশিদের মুক্তির বিষয়ে লিবিয়ায় ত্রিপক্ষীয় আলোচনার আগেই ছয়জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায় ইউরোপে মানবপাচারে তৎপর দালালচক্র। জিম্মি করা ওই ছয়জনের কাছ থেকে জনপ্রতি সাত লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে।

চক্রের হাতে জিম্মিদের স্বজনদের কাছ থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জিম্মি হওয়া ছয়জনের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরে। তাঁরা হলেন ফয়সাল আকন, মো. শহিদ, নাঈম শেখ, রাকিব শেখ, মো. রাব্বি ও সাব্বির। স্বজনদের দাবি, গত শনিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশি দালালচক্রের কয়েকজন সদস্য লিবিয়ার খামচাখামচি জেলে যায়। সেখান থেকে ছয়জনকে প্রথমে প্রলোভন দেখিয়ে এবং পরে জোর করে নিয়ে যায় তারা। এরপর দেশে প্রত্যেকের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাত লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ১১৪ জনের সঙ্গে এই ছয়জনও দেশে ফেরার কথা ছিল।

জিম্মি একজনের স্বজন বলেন, দুবাইয়ে অবস্থানরত কাশেম নামের এক দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করেছে দালালচক্র। এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য না থাকার কথা জানালে মুক্তিপণের অঙ্ক কমে সাড়ে পাঁচ লাখে নামায়। তবে গত মঙ্গলবার থেকে তাঁদের সঙ্গে আর কারো যোগাযোগ হয়নি। কাশেম দুবাইয়ে অবস্থান করে ইউরোপে মানব পাচারকারী চক্রের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে দেশে ফেরত আনা ১১৪ জনকে তিন দিনের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে বিকেল ৪টার দিকে বাসে করে সরাসরি হজ ক্যাম্পে নেওয়া হয় তাঁদের। এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জিয়াউল হক জানান, এই বাংলাদেশিরা লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বিভিন্ন সময় লিবিয়া পুলিশের হাতে আটকের পর তাঁদের হেফাজতে নেয় দেশটির প্রশাসন। আইওএমের সহযোগিতায় তাঁরা দেশে ফিরেছেন। জাতিসংঘের ওই সংস্থার পক্ষ থেকে প্রত্যেক যাত্রীকে তাত্ক্ষণিকভাবে খাবার ও চার হাজার ৭৫০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের বরাত দিয়ে জিয়াউল হক জানান, এঁরা গত বছরের বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভিজিট ভিসায় দুবাই, ওমান, মালয়েশিয়া যান। সেখান থেকে দালালের মাধ্যমে লিবিয়ায় যান। সেখানে দালালরা তাঁদের ত্রিপোলিতে গেমঘরে রাখে। বিভিন্ন সময়ে লিবিয়ার পুলিশ ও সেনাবাহিনী তাঁদের আটক করে। এই যাত্রীদের কাছ থেকে দালালরা ১১ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা করে নিয়েছে। এঁদের কেউ ছয় মাস, কেউ ৯ মাস জেল খেটেছেন।

গতকাল সকাল থেকে বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় দালালচক্রের খপ্পরে পড়ে তাঁরা সব হারিয়েছেন। অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়েছেন আগেই। এখন তাঁদের ছেলেরাও ফিরেছে প্রায় পঙ্গু অবস্থায়। তবু ছেলেদের ফেরত পেয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাচ্ছেন।

জানা গেছে, পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশি লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার সময় লিবিয়ায় একটি বেসামরিক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। তাঁদের বেনগাজির খামচাখামচি নামক একটি জেলে আটকে রাখা হয়। জেলে দীর্ঘ চার মাস ধরে বন্দি থাকার সময় নির্মম নির্যাতন ও খাবারের অভাবে অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন।

আইওএমের একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও লিবিয়া সরকারের সঙ্গে তাদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত আনা হয়েছে। সংস্থার একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, এই বাংলাদেশিদের প্রত্যেকের আর্থ-সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে তাঁদের ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা দেওয়া হবে। মুক্তির আলোচনার মধ্যেই ছয় বাংলাদেশিকে জিম্মি করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না।

স্বজনদের অশ্রুসজল অপেক্ষা : ইতালিতে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার টোপ ফেলে শরীয়তপুরের নড়িয়ার হৃদয় হাওলাদারের পরিবার থেকে প্রায় ১৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল দালালচক্র। গতকাল তাঁকে বাড়িতে নিতে বিমানবন্দরে আসেন ভগ্নিপতি মহিউদ্দিন। তিনি জানান, হৃদয়ের বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কিছুদিন আগে লিবিয়া থেকে কেউ একজন জানিয়েছিল যে হৃদয় মারা গেছে। এই খবর শোনার পর ভেঙে পড়েন তিনি। সেই থেকে অসুস্থ। তবে ছেলে বেঁচে আছে এবং দেশে ফিরছে—এমন খবরেও তিনি পুরো সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। যে পথ দিয়ে উড়োজাহাজের যাত্রীরা বের হয়, তার পাশেই বসে কাঁদছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব খবিনর বেগম।

তিনি অভিযোগ করেন, মাদারীপুরের লিটন হাওলাদারসহ দালালচক্রের পাঁচ সদস্য তাঁর ছেলেকে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে গত বছরের ২৬ মার্চ ১০ লাখ টাকা অগ্রিম নেয়। কিন্তু চক্রটি ইতালি না পাঠিয়ে লিবিয়ায় মানব পাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয় আমিনুলকে।

 

এ বিভাগের অন্যান্য